ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কথিত ‘মব’ কার্যক্রম সংগঠনের অভিযোগে আলোচিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) দুই নেতা এবার নিজেরাই ‘মব’ হামলার শিকার হয়েছেন।
ডাকসু সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ এবং সমাজকল্যাণ সম্পাদক এ বি জুবায়ের বৃহস্পতিবার এ ধরনের হামলার শিকার হন। এ ঘটনায় ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ‘মব’ কৌশলের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার মেয়ে জায়মা রহমানকে নিয়ে দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। অভিযোগ উঠেছে, পোস্টে প্রধানমন্ত্রী ও তার মেয়েকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও জামায়াত ইসলামীর ছাত্রশিবিরের কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সম্পর্ক আরও তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
মুসাদ্দিক ও জুবায়েরের বিরুদ্ধে ‘মবক্রেসির’ অভিযোগ
মুসাদ্দিক ও জুবায়েরের বিরুদ্ধে ‘মব’ কৌশলের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পরতেই তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই উল্লেখ করেছেন, একই দুই ডাকসু নেতা আগে থেকেই এমন ‘মব’ সংগঠনের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন।
গত বছরের অক্টোবরে ডাকসু নির্বাচনে জয়ের পর এ বি জুবায়ের এমন একটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ফুটপাতে অস্থায়ী বিক্রেতা, হকার, মাদকসেবী এবং ভবঘুরেদের সরানোর চেষ্টা করা হয়। এ অভিযানে এক শিক্ষককেও হয়রানির অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
এরপর থেকেই জুবায়ের ও মুসাদ্দিক ক্যাম্পাসে ‘মবকেন্দিক’ আলোচনার তুঙ্গে অবস্থান করছিলেন। তাদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম জামাল উদ্দিনকে একটি ভবনের ভেতরে ধাওয়া ও হেনস্তা করা হচ্ছে।
বিভাগের সিঁড়িতে জুবায়ের ওই শিক্ষকের পথ রোধ করলে তিনি বারবার সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পরে তিনি গাড়িতে উঠে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে জুবায়ের তখনও তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করেন।
ঘটনার পর জুবায়ের নিজেই তার ফেসবুকে ভিডিওটি শেয়ার করে লেখেন, তিনি ও আরও চারজন মিলে একজন ‘ফ্যাসিস্ট শিক্ষককে’ আটক করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তিনি গাড়িতে করে চলে যান।
এ বিষয়ে হেনস্তার শিকার অধ্যাপক জামাল উদ্দিন সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দাবি করেন, সেখানে কেবল নাস্তা করতে গিয়েছিলেন এবং মতাদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও একজন শিক্ষক হিসেবে তার সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত হয়নি।
এরপর গত ৭ মার্চ ক্যাম্পাসে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ প্রচার করাকে কেন্দ্র করে বিপরীতমুখী অবস্থান নেয় ডাকসু ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ এমির নেতৃত্বে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতার আটক হওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে সেদিন ক্যাম্পাসে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কর্মসূচি চলাকালে মুসাদ্দিকের নেতৃত্বে একটি দল সেখানে গেলে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এ সময় এমির সঙ্গে থাকা আবদুল্লাহ আল মামুন নামে এক ব্যক্তিকে ছাত্রলীগ কর্মী বলে চিহ্নিত করে মারধর করা হয়। এমি অভিযোগ করেন, তাকেও হয়রানি করা হয়েছে।
পরে এমিকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এখনও কারাগারে আছেন।
তবে মুসাদ্দিক এ ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন। তার দাবি, তিনি কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করেননি এবং অভিযুক্তদের কেবল শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করে তদন্তের পর ব্যবস্থা নিতে পুলিশের কাছে অনুরোধ করেছিলেন।
শাহবাগ থানায় কি ঘটেছিল
সবশেষ গত বৃহস্পতিবারের হামলার ঘটনায় ছাত্রশিবির দাবি করে, মুসাদ্দিক ও জুবায়েরসহ তাদের কয়েক সদস্যকে শাহবাগ থানার ভেতরে হেনস্তা করা হয়েছে।
আহতদের অভিযোগ, ছাত্রদলের কর্মীরা এ হামলা চালিয়েছে। অবশ্য ছাত্রদল প্রাথমিকভাবে এ দায় অস্বীকার করেছে।
ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
উপাচার্য ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, তদন্ত শেষে কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্যাম্পাসের অনেক শিক্ষার্থী বলছেন, জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্রশিবির-সমর্থিত কিছু ডাকসু নেতা ক্যাম্পাসে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ‘মব’ কার্যক্রম সংগঠনের অভিযোগ ওঠে।
এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম মুসাদ্দিক আলী ও এ বি জুবায়ের।
জাতীয় রাজনীতির প্রভাব ক্যাম্পাস রাজনীতিতে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তার প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতেও পড়তে শুরু করে।
২০২৫ সালের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল জয় পেলেও বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল কোনো আসন পায়নি।
তবে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের পর ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের উপস্থিতি বাড়ে, যা ছাত্রশিবিরের সঙ্গে তাদের সংঘাতকে আরও তীব্র করে তোলে।
ছাত্রশিবিরের ‘মবতন্ত্র’
ছাত্রদলের নেতারা অভিযোগ করেছেন, ছাত্রশিবির-ঘনিষ্ঠ কর্মীরা ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য ‘মব’ কৌশল ব্যবহার করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও হল ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রদলের তিন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রশিবির-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ‘মবতন্ত্র’ পদ্ধতিতে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
তাদের দাবি, গত দুই বছরে ছাত্রশিবির-ঘনিষ্ঠ কর্মীরা বারবার আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন এবং বিভিন্ন ‘মব’ সহিংসতায় জড়িয়ে তাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের একটি ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, জুলাইয়ের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ছাত্রশিবির তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে।
তিনি লেখেন, ‘তারা অন্যদের রাজনৈতিক পরিসর সীমিত করার চেষ্টা করেছে এবং “মব” তৈরি করে ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। ৫ আগস্টের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে হলগুলোতেও প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে।’
ডাকসু নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদের প্রার্থী উমামা ফাতেমা বলেন, ‘হলভিত্তিক ছাত্র প্রতিনিধি গঠনের উদ্যোগটি সাবেক উপাচার্যের সময় শুরু হয়েছিল। তখন ছাত্রশিবির-ঘনিষ্ঠ নেতারা “সাধারণ শিক্ষার্থী” পরিচয়ে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন এবং হলের সমস্যা সমাধানের নামে এতে অংশ নেন।’
অন্যদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, তিনি সবসময় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্যেই কাজ করেছেন।
‘কেউ কেউ দাবি করেছেন আমরা “মব” করেছি, আবার কেউ বলেছেন আমরা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সমাবেশ করেছি। কিন্তু কেউ প্রমাণ করতে পারেনি যে আমরা বলপ্রয়োগ করেছি বা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন’, যোগ করেন তিনি।
শাহবাগ থানায় সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায়ও তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।


