ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী দুই ভূমিকম্পে অন্তত ৯২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন তিন হাজার ৩৬০ জন। এখনো নিশ্চিত ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন ১৭২ জন। এ ছাড়া নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে শুক্রবারও মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে গেছেন উদ্ধারকর্মী ও স্বজনরা। তবে ভূমিকম্পের প্রায় দুই দিন পর বিদেশি উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে শুরু করায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
এরমধ্যেই শুক্রবার বিকালে আবারও ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে দেশটি। রাজধানী কারাকাস ও কাছের মারাকাই শহরে ৪ দশমিক ৯ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
বৃহস্পতিবারের জোড়া ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি সমুদ্র সৈকতের শহর লা গুয়াইরা। এ অঙ্গরাজ্যে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতার ধীরগতি ঘিরে স্থানীয়দের ক্ষোভ বাড়ছে। ভারী যন্ত্রপাতির সংকট এবং সরকারি সহায়তা সীমিত থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবীরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
২৫ বছর বয়সী জেনিফার পালাসিওস জানান, লা গুয়াইরা শহরের আটটি টাওয়ারবিশিষ্ট হুগো চাভেজ আবাসন প্রকল্পের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও তার ছয় বছরের ছেলে এবং পরিবারের আরও পাঁচ সদস্য আটকা পড়ে আছেন।
তিনি বলেন, ‘জীবিত মানুষদের উদ্ধার করেছে মূলত স্থানীয়রাই। কংক্রিটের বিশাল স্ল্যাব সরাতে দ্রুত ক্রেন প্রয়োজন। এখনও অনেক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন।’
এই বিপর্যয় অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের জন্যও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তিনি নিজেকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরলেও ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এদিকে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের ধারণা, শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এটি গত এক শতাব্দীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী লাতিন আমেরিকান ভূমিকম্পগুলোর একটি হয়ে উঠবে।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, প্রায় ৭০ লাখ মানুষ এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। সংস্থাটি জরুরি আশ্রয়, ত্রাণসামগ্রী এবং অন্যান্য মানবিক সহায়তা বিতরণ শুরু করেছে।

রয়টার্সের সাংবাদিকরা ভেঙে পড়া মহাসড়ক পেরিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে দেখতে পান, অসংখ্য বহুতল ভবন ধসে কংক্রিট ও লোহার স্তূপে পরিণত হয়েছে। উদ্ধারকর্মীদের সুবিধার জন্য অনেক ধ্বংসস্তূপে ভবনের নাম স্প্রে পেইন্ট দিয়ে লিখে রাখা হয়েছে।
রাজধানী কারাকাস ও ভ্যালেন্সিয়া থেকে মোটরসাইকেলে করে স্বেচ্ছাসেবীরা খাদ্য ও জরুরি সরঞ্জাম নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাচ্ছেন। প্রথমদিকে স্বেচ্ছাসেবীদের ধন্যবাদ জানালেও পরে ডেলসি রদ্রিগেজ ও অন্য সরকারি কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে লা গুয়াইরা শহরে না যাওয়ার আহ্বান জানান। তাদের মতে, সড়কে অতিরিক্ত যানজট সৃষ্টি হওয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। তারা ঘোষণা দেন, ওই অঞ্চলে স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে শুধু সরকারি ও নিবন্ধিত উদ্ধারকারী দলের যানবাহন ছাড়া অন্য সব যান চলাচল বন্ধ থাকবে।
৭৩ বছর বয়সী আইনজীবী রিকার্দো ত্রিয়াস জানান, তার ৫৪ বছর বয়সী ছেলে আরমান্দো লোপেসের মরদেহ বৃহস্পতিবার রাতে উপকূলীয় শহর কারাবাইয়েদার একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হলেও সেটি এখনও ঘটনাস্থলেই পড়ে আছে। তারা মরদেহটি বুঝে নিতে চাইলেও কেউ তা হস্তান্তর করছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। জানান, মরদেহ পড়ে থাকলে সেটি পচে যাবে। এখনও কোনো ফরেনসিক কর্তৃপক্ষ সেখানে আসেনি।
লা গুয়াইরার কাতিয়া লা মার শহরে ক্ষতিগ্রস্ত একটি দোকান থেকে টয়লেট টিস্যু, রান্নার তেল, রুটি ও অন্য পণ্য লুট করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে স্থানীয়দের। ঘটনাস্থলে পুলিশ, জাতীয় রক্ষীবাহিনী কিংবা অন্য কোনো সরকারি সংস্থা লুটপাট ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করেনি।
বহু দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো বৃহস্পতিবার রাত থেকে ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাতে শুরু করেছে।
শুক্রবার ডেলসি রদ্রিগেজ টেলিফোনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে তিনি ও অন্যান্য কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড এবং দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ১৫ কোটি মার্কিন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পাশাপাশি দুটি জাহাজ পাঠিয়েছে। উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য সামরিক হেলিকপ্টার ও উড়োজাহাজও মোতায়েনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সমুদ্রতীরবর্তী লস কোরালেস এলাকায় এল সালভাদরের ৫০ সদস্যের উদ্ধারকারী দল ড্রোন, তাপ শনাক্তকারী যন্ত্র এবং অনুসন্ধানী কুকুর ব্যবহার করে ১০ তলা তিনটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে জীবিত মানুষের সন্ধান চালাচ্ছে।
দলটির প্রধান রোবের্তো গাভিদিয়া বলেন, স্থানীয়রা জানিয়েছেন তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলতে পেরেছেন। ফোন ধরার পাশাপাশি ভেতর থেকে সাহায্যের জন্য চিৎকারও শোনা যাচ্ছে।
এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে জানান, উদ্ধারকারীরা একটি ভবনের নবম তলায় পোষা প্রাণীসহ আটকে থাকা ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর অবস্থান শনাক্ত করেছেন এবং তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে দুর্বল হয়ে পড়া ভেনেজুয়েলার জন্য এই ভূমিকম্প নতুন বিপর্যয় হয়ে এসেছে। ৫০ বছর বয়সী সুহাইল সারকিস বলেন, তার বসবাসের ভবনটি এখন আর থাকার উপযোগী নয়। কয়েক মাস আগে তিনি চাকরিও হারিয়েছেন। এখন তার সঙ্গে শুধু ছেলে রয়েছে, দেশে আর কোনো স্বজন নেই।


