বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্থান-পতন

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্থান-পতন
Advertisement
Advertisement

২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’। এরপর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনেও বড় ভূমিকা রাখে তারা। কিন্তু এর দুই বছরের মধ্যেই সংগঠনটি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।

এই সময়ের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটির বেশ কয়েকজন নেতা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন, কেউ নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন, আবার অনেকে আন্দোলন ছেড়ে দূরে সরে গেছেন।

সাবেক নেতারা জানান, সরকার পতনের পরপরই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদের শুরু হয়। পরবর্তীতে মূল দুই সমন্বয়ক–নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেন। এরপর তাদের উদ্যোগে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠিত হয়, যা থেকে পরে নতুন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন গড়ে ওঠে।

তাদের মতে, এসব ঘটনার কারণে রাজপথের দল হিসেবে আন্দোলনটির শক্তি কমে যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা ও উপজেলায় যেভাবে সমন্বয়ক কমিটি তৈরি ও পরিচালনা করা হচ্ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

সাবেক সমন্বয়কদের অভিযোগ, প্ল্যাটফর্মটি আর ‘জুলাইয়ের চেতনা’ ধরে রাখতে পারেনি। বরং এটি এখন নির্দিষ্ট কিছু মানুষ ও গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারের হাত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

তারা আরও বলেন, সবার সঙ্গে আলোচনা না করেই কেন্দ্রীয় নেতারা একতরফা সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। এসব কারণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ও যুগ্ম সমন্বয়করা পদত্যাগ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুলাইয়ের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ক্ষমতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতায় বসানোর পর শিক্ষার্থীদের একটা অংশও ক্ষমতার অংশীদার হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, তারা চাইলে ক্ষমতার বাইরে থেকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে রাজপথে থাকতে পারতেন। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের দাবি আদায় করা সহজ হতো। কিন্তু ক্ষমতার অংশ হওয়ায় তারা সেই সুযোগ হারিয়েছেন।

আরও পড়ুন

এলাকাভিত্তিক কমিটি স্থগিত

জুলাই আন্দোলনের পর প্ল্যাটফর্মটির একাংশ বিভিন্ন এলাকায় কমিটি গঠনের কাজ শুরু করে। তবে নির্বাহী কমিটির কয়েকজন সদস্য এর বিরোধিতা করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, এসব কমিটি মূলত ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল গঠনের অংশ হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।

এরপর চাঁদাবাজির অভিযোগে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হলে, ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া বাকি সব কমিটির কাজ স্থগিত করে দেওয়া হয়।

সংগঠনের সভাপতি রিফাত রশীদ টাইমসকে বলেন, ‘কিছু লোক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে অসৎ কাজ করার চেষ্টা করেছে। দুর্ভাগ্যবশত, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবে পড়ে আমাদের কিছু কর্মী দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে, যা এখন আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।’

উমামা কেন পদত্যাগ করলেন?

গত ২৮ জুন সংগঠনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার অভিযোগ ছিল, অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত বা গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

সাবেক নির্বাহী সদস্যরা জানান, নেতাদের কাছের মানুষদের পদ ও সুবিধা দেওয়ায় সাধারণ কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ে।

রিফাত হাসান নামের এক সাবেক সদস্য জানান, সমন্বয়কের পদ নিয়ে টানাপোড়েন এবং প্রভাব খাটানোর প্রতিযোগিতার কারণে এই প্ল্যাটফর্মের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস উঠে গেছে।

‘সংগঠনটি ভেঙে দেওয়া উচিত ছিল’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক এবং আন্দোলনের সাবেক সহসম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ টাইমসকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের পরপরই এই সংগঠনটি বিলুপ্ত করা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, ‘নেতাকর্মীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি আর দুর্নীতির অভিযোগে সবাইকে লজ্জায় পড়তে হয়েছে।’

তবে ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের পূর্বাঞ্চলে বন্যার সময় ত্রাণ সংগ্রহ করে সংগঠনটি বেশ সুনাম কুড়িয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে সেই ত্রাণের টাকা হিসাব ও বণ্টনের নানা অনিয়ম নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়।

সাবেক নির্বাহী সদস্য লুৎফর রহমান টাইমসকে জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক ভাবধারার মানুষ একসাথে হওয়ায় ভেতরে ভেতরে বিভেদ তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের সময় এবং পরে নানা মতের মানুষ এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছিল। তাই এক দল এনসিপিতে গেছে, আরেক দল গেছে ছাত্র শক্তিতে।’ তবে এই প্ল্যাটফর্মটি ভবিষ্যতে একটি ‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন’ হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবে বলে তিনি জানান।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad