বিপন্ন গোপালগঞ্জের বর্ণি বাঁওড়ের মৎস্যসম্পদ

বিপন্ন গোপালগঞ্জের বর্ণি বাঁওড়ের মৎস্যসম্পদ
গোপালগঞ্জের বর্ণি বাওড়। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে একসময় প্রচুর মাছের জন্য বিখ্যাত গোপালগঞ্জের ঐতিহাসিক ‘বর্ণি বাঁওড়’। পলি জমে যাওয়া, জলজ আগাছার বিস্তার ও বেআইনিভাবে মাছ ধরার কারণে এই জলাভূমির পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। একসময় কলকাতার বাজার পর্যন্ত ছিল এই বাঁওড়ের মাছের নামডাক।

গোপালগঞ্জ সদর ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই বাঁওড়টি দিন দিন তার গভীরতা ও মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির পরিবেশ হারাচ্ছে। ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছে দেশি মাছ, জীববৈচিত্র্য আর এর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা শত শত পরিবারের জীবিকা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ চায়না জাল ও কারেন্ট জাল এবং ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছের ডিম, পোনা ও জলজ প্রাণী ধ্বংস করা হচ্ছে। অন্যদিকে কচুরিপানা ও পলি জমে জলাশয় ছোট হয়ে যাওয়ায় মাছের আবাস ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

অবশ্য মৎস্য বিভাগ বাঁওড়ে মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করছে, অবৈধভাবে মাছ ধরার বিরুদ্ধে অভিযানও  চালাচ্ছে। তবে স্থানীয়দের মতে, পানিপ্রবাহ ও গভীরতা ফিরিয়ে আনতে নদী খনন, আগাছা পরিষ্কার এবং বাঁওড়ের জমি দখলমুক্ত করার জন্য স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা দরকার।

দক্ষিণ বাংলাদেশের অন্যতম ধনী প্রাকৃতিক মৎস্যভাণ্ডার ছিল এই বর্ণি বাঁওড়। রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, শোল, টেংরা, কৈ, পুঁটি, পাবদা, আইড়, চিতল ও কচ্ছপসহ অসংখ্য প্রজাতির মাছ ও প্রাণীর নিরাপদ বাসস্থান ছিল এটি।

বাঁওড়ে মাছ ধরেই এলাকার বহু মানুষ জীবন চালাতেন। মাছ ধরা হয়ে ওঠেছিল তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।

অথচ এখন বাঁওড়ের একটা বড় অংশজুড়ে শুধু কচুরিপানা, শ্যাওলা আর আগাছা। পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় শীতকালে বহু জায়গা শুকিয়ে যায়, যার ফলে মাছের চলাফেরা ও বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম হোসেন জমাদ্দার টাইমস’কে জানান, চায়না জাল, কারেন্ট জাল আর কারেন্ট শক দিয়ে দেদারসে মাছ ধরার কারণেই দ্রুত সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘বড় মাছ, ডিম, ছোট পোনা থেকে শুরু করে অন্য জলজ প্রাণীও শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো দেশি মাছ এখন আর দেখাই যায় না।’

আরও পড়ুন

৬০ বছর বয়সী জেলে সুনীল সরকার বলেন, ছোটবেলা থেকে তিনি এই বাঁওড়কে চোখের সামনে বদলে যেতে দেখেছেন।

নিজের শৈশবের কথা মনে করে তিনি বলেন, একসময় জেলেরা বড় বড় রুই, কাতলা, মৃগেল, শোল, বোয়াল, পাবদা, সরপুঁটি, আইড় ও চিতল মাছ ধরতেন। তখন পানি এত গভীর ছিল যে লগি দিয়ে ঠেলে নৌকা চালানো কঠিন হতো।

তিনি বলেন, ‘এখন ভরা বর্ষায়ও অনেক জায়গায় পানি মাত্র ৮ থেকে ১০ হাত। আর অন্য সময় তা কমে ৪ থেকে ৫ হাতে নেমে আসে। শীতকালে তো অনেক জায়গায় মাটি পর্যন্ত উঠে যায়।’

সুনীল সরকার মনে করেন পলি জমা, ফসলের জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার এবং ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা এই বাঁওড়ের পরিবেশ নষ্টের প্রধান কারণ।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বাঁওড়ের অবস্থা খুবই খারাপ। এভাবে চললে কয়েক দিন পর এখানে আর একটা মাছও থাকবে না।’

আরেক বাসিন্দা জাদির হোসেনের অভিযোগ, এলাকার প্রভাবশালী কিছু মানুষ বাঁওড়ে কাথা (মাছ আটকানোর ঘের) দিয়ে মাছ ধরে ফেলে। একারণে সাধারণ জেলেরা মাছ ধরার সুযোগ পায় না।

তিনি আরও জানান, বছরের বেশিরভাগ সময় কচুরিপানা ও আগাছায় বাঁওড় ঢাকা থাকে। এ ছাড়া কাঁচা পাট পচানো ও বিভিন্ন বর্জ্য ফেলার কারণে পানি দূষিত হয়ে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে।

তবে ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো বন্ধ করে প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনলে বরণি বাঁওড় আবার আগের মতো মাছে ভরে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

গোপালগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম জানান, বাঁওড়টি রক্ষায় সরকার ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। মাছ যেন নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে, সেজন্য কিছু অভয়াশ্রম তৈরি করা হয়েছে।

পাশাপাশি নিষিদ্ধ জাল জব্দ ও বেআইনিভাবে মাছ ধরা বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তবে কামরুল ইসলামও স্বীকার করেন, মাছের প্রজনন রক্ষা ও জেলেদের স্থায়ী জীবিকার জন্য বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার।

এজন্য এলাকার মানুষ বাঁওড় খনন, কচুরিপানা পরিষ্কার, অবৈধ দখল বন্ধ এবং ক্ষতিকরভাবে মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধে একটি কার্যকর উদ্যোগ চান।

তারা মনে করেন, বর্ণি বাঁওড় রক্ষা করা গেলে শুধু বিপুল পরিমাণ মাছই বাঁচবে না—একই সাথে টিকে থাকবে এলাকার পরিবেশ, ঐতিহ্য আর শত শত জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad