বিএনপির সঙ্গে ভবিষ্যত সরকারের অংশ হতে আগ্রহ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে যেভাবে অতীতে রাজনৈতিক মিত্রতা ছিল, আগামী দিনেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান তারা। আর এতে বিএনপিও অনাগ্রহী নয়।
জামায়াত নেতাদের মতে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং সরকার গঠনের অবস্থানে যায়, সে ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব দেবে জামায়াত। অন্তত পাঁচ বছরের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং দেশে একটি সহনশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই এই উদ্যোগ বলে দলটির নেতাদের বক্তব্য।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের অংশ ছিল জামায়াতে ইসলামী। ওই সময় দলটির দুই নেতা মন্ত্রিসভায় ছিলেন। আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি আবার সরকার গঠন করতে পারলে সেই সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী জামায়াত।
সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই আগ্রহের কথা তুলে ধরেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত অবস্থান জানানো হয়নি। দলটির নেতারা বলছেন, বিএনপি সব সময় টেকসই গণতন্ত্রের পক্ষে এবং দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চায়।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’-সংক্রান্ত যে সুপারিশগুলো এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচন–পরবর্তী সরকার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিএনপি যদি কেবল নির্বাচনে জোটবদ্ধ দলগুলো নিয়ে সরকার গঠন করে, তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কা জামায়াতের। এ কারণেই জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবটি সামনে আনছেন দলটির নেতারা।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে আসন্ন নির্বাচন, সরকার গঠন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে, জামায়াতের নেতারা বিভিন্ন সভা, সমাবেশ ও আলোচনায় আগেও জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আগ্রহের কথা বলেছেন। দলটির ধারণা, দীর্ঘ ১৭ বছর পর নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া জামায়াতে ইসলামী ভোটের হিসাবে বিএনপির পর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকতে পারে। সে কারণেই প্রথম অবস্থানে থাকা বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা বজায় রাখার আগ্রহ প্রকাশ করছে দলটি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি শোক পালন করছে। এই সময় জামায়াতের আমিরসহ কয়েকজন নেতা সমবেদনা জানাতে গুলশানের কার্যালয়ে আসেন এবং শোক বইয়ে সই করেন। আলোচনার একপর্যায়ে তারা তাদের রাজনৈতিক আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন। তবে ভবিষ্যতে কী হবে, সে বিষয়ে এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি।
বিএনপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, দেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাবে—এ বিষয়টি জামায়াতও বুঝতে পারছে। তিনি বলেন, একসময় জামায়াত বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করে বিএনপির বিরোধিতা করেছে। তবে গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি, জামায়াত ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমাজ একসঙ্গে আন্দোলন করেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সময়েও জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল-এ কথাও দেশবাসীর অজানা নয়।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমসকে বলেছেন, ‘দলের আমির স্পষ্ট করে বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে অতীতের মতোই জামায়াত কাজ করতে চায়। একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে চাওয়া মানেই জাতীয় সরকার গঠন করা-বিষয়টি এরকম নয়। তবে, দেশের স্থিতিশীলতা ও ফ্যাসিবাদ মুক্ত রাখতে হলে ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী দিনের পথ চলার কোন বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে অনেকে জাতীয় সরকার গঠনের কথা সামনে আনছেন।’
একটি সূত্র জানায়, ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বেশি পড়লে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ সহজ হবে। এই বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জামায়াত।
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের আরেক নেতা বলেন, জামায়াতের রাজনৈতিক চরিত্র অতীতে একাধিকবার বদলেছে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে তাদের প্রস্তাবগুলো খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সূত্র জানায়, গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে ইতোমধ্যে জামায়াতের নির্বাচনী সমঝোতা হয়েছে। কয়েকটি আসনে তাদের বিজয় নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, তারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সমবেদনা জানিয়েছেন এবং দেশের স্বার্থে ভবিষ্যতেও বিএনপির সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার আগ্রহের কথা বলেছেন। একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে—এই বাস্তবতায় নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়, সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।


