পাহাড়ধস রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে: এইচআরডব্লিউ

পাহাড়ধস রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে: এইচআরডব্লিউ
ভারী বৃষ্টিপাতের পর ক্ষতিগ্রস্ত বালুখালী ক্যাম্পের ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কাজ করছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। ফাইল ছবি: এএফপি/বিএসএস
Advertisement
Advertisement

জুলাই মাসে পাহাড়ধসে বাংলাদেশে অন্তত ১৭ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী নিহত এবং ৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, এ ঘটনা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান ভয়াবহ ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে।

সোমবার এক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরেছে এইচআরডব্লিউ।

প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের অনেক পরিবার বাঁশ ও ত্রিপলের তৈরি ঘরে, খাড়া ও বন উজাড় করা পাহাড়ি ঢালে গাদাগাদি করে বসবাস করছে, যা বর্ষাকালে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও ভূমিধসে এসব ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে প্রাণহানি ও আহত হওয়ার বিষয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা বারবার সতর্ক করেছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।

এইচআরডব্লিউ বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ এবং দাতাদের প্রতি ক্যাম্পে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমানো, বাঁধ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, চলাচলের পথ এবং নিরাপদ পুনর্বাসন এলাকার জন্য সহায়তা পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য প্রতিটি বর্ষাকাল ক্রমান্বয়ে আরও বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। ক্যাম্পগুলো সুরক্ষার তহবিল সংকুচিত হয়ে আসায় গাছপালাহীন পাহাড় ধসে অস্থায়ী ঘরবাড়ির ওপর পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘এগুলো কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এমন কিছু নীতির অনুমেয় পরিণতি যা শরণার্থীদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’

রোহিঙ্গা কোঅর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে আবহাওয়া সংক্রান্ত ২৮৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ২৬ হাজার ১১৯ জন শরণার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৯৫টি পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪ হাজার ৩০৭ জন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, ২ হাজার ৮০৯টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৩টি ঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।

এ ছাড়া লার্নিং সেন্টার (শিক্ষা কেন্দ্র), স্যানিটেশন সুবিধা, রিটেইনিং ওয়াল (প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল), চলাচলের পথ, সেতু এবং রাস্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ১ হাজারেরও বেশি শরণার্থীকে সরিয়ে নিলেও অনেকেই তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি হননি।

আরও পড়ুন

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পাঁচজন শরণার্থী এবং চারজন সাহায্যকর্মীসহ মোট ৯ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। একজন পানি ও স্যানিটেশন প্রকৌশলী জানান, ক্যাম্পের নকশায় শুরু থেকেই ত্রুটি ছিল। তিনি যোগ করেন, ‘পাহাড় কেটে এবং কোনো পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছাড়াই এই ক্যাম্পগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এখন তহবিল ঘাটতির কারণে পাহাড় ধস প্রতিরোধের টেকসই কাজগুলো ঠিকমতো করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সরকার এখানে স্থায়ী কোনো স্থাপনা তৈরির অনুমতি দিচ্ছে না।’

ক্যাম্পে নতুন আসা রোহিঙ্গারা বিশেষ করে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, কারণ তারা প্রায়শই অনিরাপদ জায়গা ভাড়া নিতে বাধ্য হন। ২০২৪ সালের আগস্টে আসা এক ব্যক্তি জানান, গত ৬ জুলাই পাহাড়ের ঢালে তাদের অস্থায়ী ঘর ধসে পড়ার পর তার দুই মেয়ে এবং দুই নাতি-নাতনি মারা যায়।

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান লড়াইয়ের কারণে অন্তত ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে কক্সবাজারে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

সাহায্য সংস্থাগুলো বলছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী ধারণার চেয়ে তিন গুণ বেশি শরণার্থী চলে আসায় জায়গা সংকুলান হচ্ছে না। আরও জমির জন্য ইউএনএইচসিআর-এর আবেদন এখনো ঝুলে আছে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলছে যে শরণার্থীরা যেন বাংলাদেশকে স্থায়ী বাসস্থান হিসেবে বিবেচনা না করে।

সহায়তাকর্মীরা জানিয়েছেন, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে জায়গার অভাব এবং গোপনীয়তার (প্রাইভেসি) সংকটের কারণে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। একজন কর্মী বলেন, ‘লার্নিং সেন্টার বা অন্যান্য পুনর্বাসন কেন্দ্রে অনেক মানুষকে একসাথে থাকতে হয় এবং সেখানে টয়লেট ও প্রাইভেসির সমস্যা রয়েছে।’

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ আরও মজবুত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র এবং আধা-স্থায়ী মডেলের ঘর তৈরির অনুমোদন দেয়, যার মধ্যে দোতলা ইউনিটের পাইলট প্রকল্পও ছিল। এছাড়া ৫০ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র পুনর্নির্মাণের বিষয়েও সহমত হওয়া গিয়েছিল, কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তহবিল ঘাটতির কারণে সেই পরিকল্পনা থমকে যায়। স্থানীয় বিরোধিতাকারীরাও এখানে স্থায়ী বসতি স্থাপন এবং বনভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আশ্রয়কেন্দ্রের নিরাপত্তাকে মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। দাতাগোষ্ঠীগুলোর উচিত অনুমোদিত নিরাপদ মডেলের ঘর তৈরিতে অর্থায়ন করা এবং বাংলাদেশের উচিত দুর্যোগ-সহনশীল নকশার অনুমোদন দেওয়া।

বর্তমানে, শেল্টার অ্যান্ড ক্যাম্প কোঅর্ডিনেশন তহবিলের জন্য প্রয়োজনীয় ৭৩ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে মাত্র ৪২ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়া গেছে এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ২৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। রোহিঙ্গা কোঅর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাশয় ব্যবস্থাপনা এবং যাতায়াতের পথ উন্নত করার জন্য জরুরি তহবিলের আহ্বান জানিয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থীরা শুধু সহানুভূতি প্রকাশে উপকৃত হবে না, বরং তাদের জন্য একটি জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর উচিত পরবর্তী কোনো পাহাড় ধসে আরেকটি রোহিঙ্গা পরিবার বিলীন হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর