নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৫ জনে। এ ঘটনায় অন্তত এক হাজার ৩০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নিখোঁজ তালিকায় ৮২৬ জনের নাম রয়েছে। সেই সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতে নিখোঁজ আছেন ৫৫৮। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
নেপাল কর্তৃপক্ষ এর আগে জানিয়েছিল, নিখোঁজদের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে তিব্বতের কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ভারতীয় নাগরিকরাও রয়েছেন।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ, ৬১ জন নেপালের নাগরিক এবং ৩৪১ জন বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিরা ২৬টি দেশের নাগরিক বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে ভারতের ১৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন নাগরিক রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, তীর্থযাত্রা ও ভ্রমণকারী দলের অংশ হিসেবে থাকা অন্তত ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
অ্যাডিলেডে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি, এসব অস্ট্রেলীয় নাগরিক আলাদা বিভিন্ন তীর্থযাত্রা ও ভ্রমণ দলের অংশ ছিলেন।’
তিনি জানান, নেপাল সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চায়নি। তবে অস্ট্রেলিয়া নেপাল সরকার, জাতিসংঘ, রেড ক্রসসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে মানবিক সহায়তা নিয়ে সমন্বয় করছে।
মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, কাঠমান্ডুতে থাকা ৫৫ জন মালয়েশীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতির কারণে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে কোনো মালয়েশীয় নাগরিকের মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালে আকস্মিক বন্যা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোট ও রাসুয়া জেলায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। নুয়াকোট জেলার বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সিমেন্টের মতো ঘন কাদার স্রোতে ভবনের দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত ঢেকে গেছে। গাছের ডালে ও বৈদ্যুতিক তারে বহু স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ আটকে আছে।
কাদামিশ্রিত পানির স্রোতের তোড়ে ভেঙে পড়েছে রাস্তাঘাট। বহু যানবাহন মাটির নিচে চাপা পড়েছে। বন্যার কারণে বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে।
এ ছাড়া, চীনের তিব্বত সীমান্তে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। সকাল পর্যন্ত সেখানে দুজন গ্রামবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নেপালেও তাৎক্ষণিকভাবে কাদায় মাখা অবস্থায় আতঙ্কিত অনেক মানুষকে উদ্ধার করার খবর পাওয়া গেছে।
তিব্বতের পাহাড়ি অঞ্চলের খাড়া উপত্যকাগুলো স্থানীয় অর্থনীতি ও যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ হলেও দুর্যোগের সময় এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা শোয়াম রাজভাণ্ডারি বলেন, ‘আমি যখন ধুঙ্গে বাজারে পৌঁছাই, তার আধা ঘণ্টার মধ্যেই বন্যা এসে পুরো বাজার ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন মানুষ অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কত মানুষ নিখোঁজ বা মারা গেছে, আমরা জানি না। বন্যা এতটাই দ্রুত আঘাত হেনেছে যে অনেক মানুষ পালানোরও সুযোগ পাননি।’
এদিকে বৃহস্পতিবার ভোর থেকে নেপাল সেনাবাহিনী ও বেসরকারি হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত জানান, হেলিকপ্টার অভিযানে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্তত আটজন বিদেশি নাগরিককে কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় আটকে পড়া মানুষদেরও উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনীর দল।
স্থানীয়দের বরাতে এপি জানিয়েছে, উদ্ধারকারীরা দুর্যোগস্থল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলায় কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করেছেন। গুরুতর আহত বহু মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে।
তিব্বতে গিরং বন্দর এলাকার কাছে বুধবার একটি ভূমিধসের পর আশপাশের এলাকায় গড়ে ১ দশমিক ৫ মিটার বা প্রায় ৫ ফুট গভীর কাদা জমেছে। কিছু সড়কে কাদার গভীরতা ২ মিটার বা প্রায় ৬ ফুটের বেশি বলে জানিয়েছে সিসিটিভি।
সংবাদমাধ্যমটি জানায়, বন্দরের দিকে যাওয়ার সব সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এলাকায় হালকা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নতুন করে ধস বা ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে।
বন্দরের দিকে ভূমিধসের তীব্রতায় হ্রদের মতো খাদ তৈরি হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে এই ধসে পড়া ভূমি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। চীনা কর্তৃপক্ষ ওই এলাকায় একটি বড় সামরিক পরিবহন বিমান পাঠিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বুধবার প্রথমে কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬৬ কিলোমিটার উত্তরে এবং সীমান্ত এলাকার কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের খবর দিয়েছিল। পরে সংস্থাটি তাদের বিশ্লেষণ সংশোধন করে জানায়, এটি কোনো ভূমিকম্প নয়, আসলে ৫ দশমিক ২ মাত্রার একটি হিমবাহ ধসের ঘটনা ছিল, যা পাহাড়ি ধ্বংসাবশেষকে নদীর দিকে ঠেলে দিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, একটি হিমবাহ থেকে ধসে পড়া তুষারস্তূপ বুধবারের আকস্মিক বন্যার সম্ভাব্য কারণ। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ওই ঢলে পানির প্রবাহের গতি ও ব্যাপকতা ছিল অস্বাভাবিক। এক পর্যায়ে ত্রিশূলী নদীর একটি জায়গায় আধা ঘণ্টার মধ্যে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বা ২৭ ফুট বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোতেকোশী নদীর একটি উপনদী লহেন্দে খোলা নদীতে সর্বোচ্চ মাত্রার বন্যা দেখা দিয়েছে।
নেপাল ও তিব্বতের এই দুর্যোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় জানিয়ে জলবায়ু গবেষণা সংস্থাটির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, ‘লহেন্দে খোলা নদীতে ১৪ মাসের মধ্যে দুইবার বন্যা হয়েছে। এবার নেপালের অংশে একটি হিমবাহ থেকে বরফের পাথর ধসে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে হঠাৎ পানির বিশাল ঢেউ নিচের দিকে নেমে আসে।’
তিনি বলেন, ‘উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয় অঞ্চলে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব এখন আরও বেড়েছে।’
ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা হিমালয়ের বরফ ব্যবস্থা এখন বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলের জনপদ, অবকাঠামো ও পানির সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।
গত বছরের আগস্টেও তিব্বতে একই ধরনের আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে একটি হিমবাহ হ্রদ উপচে পড়ায় ওই দুর্যোগ সৃষ্টি হয়। এতে নয়জন নিহত হন এবং নেপাল ও চীনের মধ্যে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


