দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন গতি হারিয়ে ফেলছে মাদকবিরোধী লড়াই। শহর থেকে গ্রাম–সবখানেই মাদক এখন অনেক বেশি সহজলভ্য। মাদকসেবী এবং সাধারণ মানুষের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোর তুলনায় এখন মাদক পাওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে।
পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন রাজনৈতিক সমাবেশ, মিছিল এবং নেতাকর্মীদের চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত। এই সুযোগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) বিশেষ অভিযানগুলো ঝিমিয়ে পড়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আইন প্রয়োগের এই ঢিলেঢালা ভাব মাদক কারবারিদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
সাধারণত নির্বাচনের সময় মাদকের চাহিদা বেড়ে যায়। কারণ, এই সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ে, মানুষের মানসিক চাপ বেশি থাকে এবং বাজারে নগদ টাকার লেনদেন বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া শীতকালে মাদক সেবনের প্রবণতাও বাড়ে। এই বছর দুটি বিষয় একসাথে হওয়ায় ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ (আইস), এলএসডি, ফেনসিডিল এবং গাঁজার চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। অনেক এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা এখন প্রকাশ্যেই তাদের কাজ চালাচ্ছে। তারা ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে মাদক, এমনকি কুরিয়ার সার্ভিস ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেও মাদক বিক্রি করছে।
বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলেও আলোচনায় এসেছে। গত ৪ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত একটি সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাদকের এই বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেন এবং অভিযান জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে মাঠ পর্যায়ে এর তেমন কোনো বড় ফলাফল এখনো দেখা যাচ্ছে না।
মাদকবিরোধী সংগঠন ‘মানস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চিকিৎসক অরূপ রতন চৌধুরী ‘টাইমস অব বাংরাদেশ’কে বলেন, মাদক ব্যবসায়ীরা সচেতনভাবেই নির্বাচনের সময়টিকে ব্যবহার করছে। তিনি জানান, এখন তরুণ ভোটারদের টার্গেট করে ডিজিটাল মাধ্যমে মাদকের বিজ্ঞাপন ছড়ানো হচ্ছে। এমনকি ই-সিগারেটের ভেতরে মাদক ভরে বিক্রি করা হচ্ছে এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে এর প্রচার চালানো হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, স্টেরয়েড মেশানো নকল হুইস্কি বা মদ সেবনের ফলে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
পুলিশও এই চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেছে। অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, অপরাধ বাড়ার পেছনে মাদক অন্যতম বড় কারণ। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে তারা চাঁদাবাজি বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং মাদক নিয়ন্ত্রণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অপরাধ দমনের পুরো পরিকল্পনার মধ্যেই মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আছে বলে তিনি দাবি করেন।
মাদকের বাজার এখন অনেক বড় এবং বৈচিত্র্যময়। তালিকায় ইয়াবা, ম্যাজিক মাশরুম, ডিএমটি, এলএসডি, ক্রিস্টাল মেথ, হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, রেক্টিফাইড স্পিরিট, দেশি মদ এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে নেওয়া নেশাজাতীয় ওষুধসহ নানা রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে। সমস্যাটি বড় হলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সক্রিয়তা খুব কম দেখা যাচ্ছে।
সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ঠিক আগে ১৬০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ চক্রের প্রভাবে ঘুষের বিনিময়ে লাভজনক শহরগুলোতে কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেওয়া হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, সংস্থাটির ভেতরে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কাজ করছে, যার ফলে কিছু কর্মকর্তা বছরের পর বছর ঢাকায় থাকছেন আর অন্য এলাকায় নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অবশ্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ ‘টাইমস’কে জানান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নির্বাচনের আগে অভিযান বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, নিয়মিত কাজের বাইরেও শিগগিরই বিশেষ অভিযান শুরু হবে।
কর্মকর্তাদের বদলি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা এক জায়গায় তিন-চার বছর ধরে ছিলেন, কেবল তাদেরই নিয়ম অনুযায়ী বদলি করা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানে।
লাইসেন্সধারী মদের দোকান বা বারগুলোর অনিয়মও সামনে এসেছে। দেশে ২৩৭টি লাইসেন্সধারী বার আছে। অভিযোগ আছে যে, এসব বারে তদারকি নেই বললেই চলে। চোরাচালানের মাধ্যমে অবৈধ মদ বাজারে ঢুকছে। বারের জন্য কঠোর নিয়ম থাকলেও অনেক বার গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। সেখানে ডিজে বা ডিসকো পার্টিরও আয়োজন করা হয়।
কয়েকজন বার মালিক দাবি করেন, লাইসেন্স ঠিক রাখতে হলে বড় অঙ্কের অবৈধ লেনদেন করতে হয়। অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এবং পুলিশকে প্রতি মাসে ঘুষ দিতে হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ঢাকার অলিগলি, বস্তি এবং রেললাইন এলাকায় এখন প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি হতে দেখা যায়। কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, গুলশান, উত্তরা থেকে শুরু করে পুরান ঢাকা—সবখানেই বিক্রেতারা খদ্দের ডাকছে। মাদক পাচারের কাজে এখন শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে, কারণ পুলিশ সাধারণত শিশুদের গ্রেপ্তার করতে চায় না।
কড়াইল বস্তি, জেনেভা ক্যাম্প, মোহাম্মদপুর এবং মিরপুরের মতো এলাকাগুলোতে মাদকের কারবার গেঁড়ে বসেছে। একটি হিসাব মতে, ঢাকার বস্তিগুলোতে বসবাস করে কয়েক কোটি মানুষ। এই বস্তিগুলোই এখন মাদক বিক্রির প্রধান কেন্দ্র। স্থানীয়দের মতে, পুলিশ শুধু ছোট বিক্রেতাদের ধরে, কিন্তু বড় রাঘববোয়ালরা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারে বিক্রি হওয়া স্টেরয়েড মিশ্রিত মদ নিয়ে বেশ চিন্তিত। চিকিৎসকরা বলছেন, এগুলো নিয়মিত খেলে হৃদরোগ এবং শরীরের নানা অঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মাদক সমস্যাটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের সাথেও জড়িত। মিয়ানমার এবং ভারত থেকে নদীপথ, রেল এবং দুর্গম সীমান্ত দিয়ে মাদক দেশে ঢুকছে। কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রতিবেশী দেশগুলোতে বেশ কিছু কারখানা আছে যারা কেবল বাংলাদেশের বাজারের জন্যই ফেনসিডিল এবং নানা কৃত্রিম মাদক তৈরি করে।
বিজিবি অবশ্য দাবি করেছে, সীমান্ত সুরক্ষা তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিজিবির পরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মোর্শেদ রহমান বলেন, মাদক পাচারের ক্ষেত্রে তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছেন এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন।


