ট্রাম্পকে কি থামাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন?

ট্রাম্পকে কি থামাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন?
ছবি: এএফপি/বাসস
Advertisement
Advertisement

আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কী হচ্ছে, তা নিয়ে ঢাকায় আমাদের এত মাথাব্যথা কেন? কারণ, দেশটির রাজনীতিতে যা ঘটে, তার আঁচ এসে লাগে আমাদের গায়েও। কখনো ঢাকার রাজপথে, কখনো রাজনৈতিক অন্দরমহলে। তাই প্রতি দুই বছর পর নভেম্বর এলেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে আমাদের নজর পড়ে। টেলিভিশনে চোখ রাখি, রঙিন মানচিত্রের সামনে সংবাদ বিশ্লেষকদের উত্তেজিত আলোচনা শুনি। আর এমন ভাব করি, যেন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র চলে কোনো উচ্চতর নৈতিক আদর্শ মেনে।

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন, সিনেটের ৩৫টি আসন এবং কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদে ভোট হবে। এই নির্বাচন নিয়ে শুধু মার্কিনিদেরই আগ্রহ নয়, উদ্বেগও রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত প্রেসিডেন্টের দল আসন হারায়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এটাই প্রচলিত ধারা। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কাই অপেক্ষা করছে বলে মনে হচ্ছে।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের নিট তিনটি আসন বাড়াতে হবে। কাজটি অবশ্য সহজ নয়। দক্ষিণের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানরা নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচনী এলাকার সীমানা সাজিয়েছেন। এতে ডেমোক্র্যাটদের আসন বাড়ানোর সুযোগ কমে যেতে পারে। রাজনৈতিক ফায়দা নিতে এভাবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের কৌশলকেই বলা হয় জেরিম্যান্ডারিং। এর উদ্দেশ্য, ভোটের ফল নিজেদের পক্ষে রাখা।

ট্রাম্পের জন্য উদ্বেগের কারণ শুধু আসন হারানোর আশঙ্কা নয়, জনসমর্থনের অবস্থাও ভালো নয়। তার প্রতি সমর্থনের হার এখন ২৯ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য আরও কঠিন। সেখানে এখন রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। দুই দলের আসনসংখ্যা ৫০-৫০ হলে সমতা ভাঙার ভোট দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

কোথায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই?

সিনেটের আসন নিয়ে সবচেয়ে জমজমাট লড়াই হতে পারে পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে। মেইনে ষষ্ঠবারের মতো সিনেটর হতে লড়ছেন রিপাবলিকান সুসান কলিন্স। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন। ডেমোক্র্যাটদের সাবেক প্রার্থী গ্রাহাম প্ল্যাটনারকে অবশ্য নাটকীয়ভাবে প্রার্থিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্সকে হারিয়ে প্রার্থী হয়েছেন আবদুল এল সায়েদ। তার সঙ্গে লড়বেন রিপাবলিকান মাইক রজার্স। নির্বাচনী প্রচারে এল সায়েদকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যেই ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণ চলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তাকে ‘জিহাদি’ বলে আক্রমণ করেছেন।

ওহাইওতে নিজের আসন ধরে রাখার লড়াইয়ে নেমেছেন রিপাবলিকান সিনেটর জন হুস্টেড। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সিনেটর শেরড ব্রাউন। টেক্সাসে আবার মুখোমুখি হচ্ছেন রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন ও প্রগতিশীল ধারার অঙ্গরাজ্য আইনপ্রণেতা জেমস তালারিকো।

আলাস্কায় প্রতিনিধি মেরি পেলটোলার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান। একই রকম নামের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও নির্বাচনে থাকায় ভোটারদের জন্য প্রার্থীদের আলাদা করে চেনা আরও কঠিন হতে পারে।

আরও পড়ুন

এ ছাড়া জর্জিয়ায় জন অসফ, নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারে ক্রিস পাপাস ডেমোক্র্যাটদের হয়ে এগিয়ে রয়েছেন।

দক্ষিণ ক্যারোলাইনার লড়াইয়ে আছে আলাদা এক নাটকীয়তা। জুলাইয়ে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তার বোন ডারলিন গ্রাহামকে শূন্য আসনে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এবার সেই আসন ধরে রাখতে তাকে লড়তে হচ্ছে শিশু চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজের বিরুদ্ধে।

মার্কিন ভোটারদের কাছে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় ভূরাজনীতি নয়, নিত্যদিনের জীবনযাত্রার খরচ। এ নিয়ে সারা দেশেই ক্ষোভ বাড়ছে। কানসাসের কৃষকেরা ডিজেল ও সারের চড়া দামে হিমশিম খাচ্ছেন। ইরানের যুদ্ধ জ্বালানির খরচ আরও বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য বিরোধের চাপও পড়ছে তাদের ওপর। মানুষের জীবনকে অর্থনৈতিক দুর্ভোগের মধ্যে ঠেলে দিয়ে ভোগবাদী প্রচারণা চালালেই যে তাদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা পাওয়া যাবে, এমন আশা করার কারণ নেই।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেও জাতীয় নীতিতে এককভাবে পরিবর্তন আনতে পারবেন না। কোনো আইন কার্যকর করতে প্রেসিডেন্টের সই লাগবে। তবে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারির সুযোগ বাড়বে। সমন জারি করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তলব করা, প্রকাশ্য শুনানির আয়োজন এবং সরকারি ব্যয়ের বিল আটকে দেওয়ার মতো ক্ষমতা থাকবে তাদের হাতে।

নির্বাচন পরিচালনা নিয়েও বিতর্ক কম নয়। ক্যালিফোর্নিয়া ও আলাস্কায় অনাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিচার বিভাগ জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে আদালত এসব উদ্যোগের বেশির ভাগই সীমিত করেছেন বা খারিজ করে দিয়েছেন। বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিধি পরিষদ গেলে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগগুলো আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে পররাষ্ট্রনীতি সাধারণত ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে না। তবে এবার সেই হিসাব কিছুটা আলাদা। গাজায় গণহত্যা, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, আগ্রাসী শুল্কনীতি, ইরানের যুদ্ধ এবং ইউক্রেনের সংঘাতও নির্বাচনী আলোচনায় উঠে এসেছে।

তবে কংগ্রেসে ক্ষমতার পালাবদল হলেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে, এমন আশা করার কারণ নেই। পররাষ্ট্রনীতিতে ক্যাপিটল হিলের প্রভাব পাঠ্যবইয়ে যতটা গুরুত্ব পায়, বাস্তবে ততটা নয়। বড় পরিবর্তন আনার ক্ষমতাও ডেমোক্র্যাটদের সীমিত। তারা বড়জোর নিয়ন্ত্রিত বিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবেন।

তারপরও যুদ্ধের প্রশ্নে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে চাপে ফেলতে পারে। ইরানের যুদ্ধ, সামরিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে স্বচ্ছতা দাবি করতে পারে। এসব বিষয়ে সংশয়ী প্রতিনিধি পরিষদ প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক পদক্ষেপের সুযোগও কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। লন্ডন থেকে বেইজিং পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের সরকার তাই মঙ্গলবারের নির্বাচনের ফলের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তাদের কাছে এই ফল ট্রাম্পের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের শক্তি যাচাইয়েরও একটি পরীক্ষা।

বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায়?

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার সবচেয়ে বড় উত্তর তৈরি পোশাকশিল্প। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারও যুক্তরাষ্ট্র।

গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার পর ঢাকা শুল্কের হার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে এনেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে সেই সমঝোতার কাঠামো ভেঙে পড়ে। ফলে এখন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নিয়মিত শুল্কের পাশাপাশি নতুন ১০ শতাংশ শুল্কও দিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত শুল্ক ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হলে কংগ্রেসের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি শুল্কহারভিত্তিক কোটা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা দিয়ে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক মওকুফ করা হবে। এই কর্মসূচির জন্য যে চারটি দেশকে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখা হয়েছে, বাংলাদেশ তাদের একটি।

কানসাসের একজন ভোটার ডিজেলের দাম নিয়ে ক্ষুব্ধ, আর আশুলিয়ার একজন পোশাকশ্রমিক শার্ট সেলাই করছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিপণিবিতানের জন্য। দুইজনের জীবন দুই প্রান্তে হলেও তারা যুক্ত একই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। মঙ্গলবারের নির্বাচনে যা-ই ঘটুক, কংগ্রেসে অচলাবস্থা তৈরি হোক কিংবা নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণহীন থাকুক, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। সেই প্রভাব সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি তাই এখন থেকেই রাখতে হবে।

বিদেশি শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থই আগে দেখে। ইতিহাসের এই শিক্ষা ভুলে গেলে চলবে না। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হবে, যদি আমরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হই।

যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের এই রাজনৈতিক নাটক নিয়ে আমরা ঠাট্টা করতে পারি। কিন্তু সেই নাটকের ঢেউ যে আমাদের উপকূলেও এসে লাগে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad