যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, সাড়ে চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে দেশ দুটি।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত পোস্টে তিনি জানান, তাৎক্ষণিকভাবে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের ঘোষণার পরও ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলা অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে কিয়েভ।
রাশিয়া এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ট্রাম্পের ঘোষণাকে সবার জন্য ‘সুসংবাদ’হিসেবে স্বাগত জানালেও বলেন, রাশিয়া কিয়েভ ও খারকিভের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাচ্ছে।
রোববার সন্ধ্যায় দেওয়া ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, সারা দিন ইউক্রেনের আকাশে রাশিয়ার ছোড়া শাহেদ ড্রোন উড়েছে। গ্লাইড বোমা ও জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা হয়েছে। সন্ধ্যায় খারকিভের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় নিশ্চিত করেছে, ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পর খারকিভে হামলাটি হয়।
জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা থেকে বিরত থাকতে প্রস্তুত। একই ধরনের পদক্ষেপ রাশিয়ার কাছ থেকেও প্রত্যাশা করছে কিয়েভ।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছে রাশিয়া। শীতকালে জনজীবন বিপর্যস্ত করে ইউক্রেনের মানুষের প্রতিরোধের মনোবল ভেঙে দেওয়াই মস্কোর উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ কিয়েভের। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা এই কৌশলকে ‘শীতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ বলে বর্ণনা করেন।
জেলেনস্কি বলেন, উত্তেজনা কমাতে ইউক্রেন অনেক প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রতিবারই ‘না’বলেছেন। এবার তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও বিশ্ববাসীর উদ্দেশে ভিন্ন কিছু বলবেন বলে আশা করছেন তিনি।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কথাও জানান জেলেনস্কি। মার্কিন জনগণের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এবং ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান তিনি।
এর আগে রোববার এবিসি নিউজের ‘দিস উইক’অনুষ্ঠানে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থায় হামলা বন্ধ করলে কিয়েভও রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করতে প্রস্তুত। এ বিষয়ে ক্রেমলিনকে সম্মত করাতে ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গত ১৪ সেপ্টেম্বরও ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, দুই দেশ একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা না চালাতে সম্মত হয়েছে। তবে সে সময়ও তিনি বিস্তারিত জানাননি। রাশিয়া একই পদক্ষেপ নিলে ইউক্রেন তা মেনে চলবে বলে জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই প্রস্তাবে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বিরোধ
এর আগে শনিবার ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট পাওয়ার সময় এসেছে। যুদ্ধ বন্ধে জেলেনস্কি যথেষ্ট উদ্যোগ নেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের উচ্চমূল্যের জন্যও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন ট্রাম্প।
এর জবাবে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া ৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলে ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমাদের ৬০ দিনের বিরতি দিন। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি হলে আমরা নির্বাচন আয়োজন করব।’
জেলেনস্কি আরও বলেন, ইউক্রেনের পরবর্তী নেতা কে হবেন, তা নির্ধারণের অধিকার দেশটির জনগণের। তবে যুদ্ধ চলাকালে নির্বাচন আয়োজন আইনগতভাবে নিষিদ্ধ এবং নিরাপদ ভোটগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও দরকার।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে সামরিক আইন জারি রয়েছে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, সামরিক আইন বহাল থাকলে নির্বাচন আয়োজন করা যায় না। এ ছাড়া রাশিয়ার হামলার ঝুঁকি, দেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা, লাখ লাখ ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিদেশে অবস্থান এবং সম্মুখযুদ্ধে সেনাদের নিয়োজিত থাকার কারণে দেশজুড়ে নির্বাচন আয়োজনকে বাস্তবিকভাবে কঠিন মনে করা হচ্ছে।
জেলেনস্কির প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৪ সালের মে মাসে শেষ হয়েছে। তবে সংবিধান অনুযায়ী, নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নেওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থাকতে পারবেন।
জাপোরিঝঝিয়ায় নিহত বেড়ে ২৩
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়ায় শনিবার রাশিয়ার বোমা হামলার পর উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে। আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা পরিষদের সহসভাপতি ও সাবেক আঞ্চলিক প্রধান ইভান ফেদোরভ এ তথ্য জানিয়েছেন।
জেলেনস্কি বলেন, ওই হামলায় চার শিশুসহ ২৩ জন নিহত হয়েছেন। ফেদোরভ জানান, আহত হয়েছেন ৩০ জনের বেশি। তাদের মধ্যে আটজন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
অন্যদিকে, রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলে রোববার ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় এক ব্যক্তি নিহত এবং দুই নারী আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।


