ইরানে মঙ্গলবার ফের ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর নতুন করে হামলা ও পাল্টা হামলায় সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় সিরিক এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চার বছরের একটি শিশুও রয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ আহতের সংখ্যা ৬৮ বলে জানিয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মঙ্গলবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক সামরিক স্থাপনা, মাইন পাতা সক্ষমতা এবং যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একাধিক হামলা হয়েছে। আহভাজ শহরের কাছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেসামরিক জিরোফট বিমানবন্দরে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চাবাহার ও হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী বন্দরনগর বান্দার আব্বাস এবং উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসকেন্দ্র আসালুয়েহতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কেশম দ্বীপেও বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম।
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেই নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। বর্তমানে ইরান কার্যত প্রণালিটি জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।
মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ ডলারের বেশি বেড়ে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর আগে সোমবার হরমুজ প্রণালি ছেড়ে যাওয়া দুটি ট্যাংকারেও হামলার ঘটনা ঘটে।
মার্কিন হামলার পর ইরানের আইআরজিসি জানায়, তারা জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যাপক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান।
তবে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী জর্ডানে ইরানের হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বাহরাইনে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে বড় ধরনের ড্রোন হামলাও চালিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী। কুয়েতের সেনাবাহিনীও জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি শত্রুপক্ষের ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে কাজ করেছে।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ১০টি ভূপাতিত করা হয়েছে এবং তিনটি প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে পড়েছে। বাহরাইনও জানিয়েছে, ইরানের কয়েকটি ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরানের আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, উত্তর ইরাকের এরবিলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত হামলা চালানো হয়েছে। এতে একটি মেরামতকেন্দ্র, কারিগরি সরঞ্জামের গুদাম এবং মার্কিন নজরদারি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
হামলায় জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরে যায় এবং কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলেও দাবি করেছে আইআরজিসি। তবে এসব তথ্য ইরাক বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।
মার্কিন হামলার পরও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানির বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান। আইআরজিসি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরও কঠোর করবে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, পারস্য উপসাগর থেকে ইরানকে তেল রপ্তানি করতে না দেওয়া হলে অন্য কোনো দেশকেও ওই অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবারের হামলার জবাব দিলে আরও বড় ও কঠোর হামলা চালানো হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আরও বড় হামলা এখনো অপেক্ষায় রয়েছে এবং তা হলে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকবে।
প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক সংঘাত থেকে অর্থনৈতিক অচলাবস্থার দিকে মোড় নিয়েছিল। গত সপ্তাহান্তে ফের দুই পক্ষের মধ্যে হামলা শুরু হয়। রোববার মার্কিন বাহিনী ইরানের লারাক দ্বীপে হামলা চালানোর পর ইরান জর্ডানে দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।
এর আগে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন ব্যাখ্যাই ওই সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে।
গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নতুন করে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে করা কোনো চুক্তির ওপর আস্থা রাখা যায় না এবং দেশটিকে যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছে।


