ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশের একটি সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ইরানপন্থী হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এতে আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০০ জন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সরকারি বাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, সোমবার সকালে শাবওয়া প্রদেশের আল আলম সেনা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আচমকা তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুথিরা। ওই সময় সেখানে বাহিনীতে নতুন নিয়োগ পাওয়া সেনাসদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছিল।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তা ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো প্রাথমিক তথ্যে ১৮ জন নিহত ও ৩০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৫৩ জনে এবং সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী তা ৫৮ জনে গিয়ে পৌঁছেছে।
হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশেদ আল-আলিমি বলেন, শাবওয়ায় প্রাণ হারানো সেনাসদস্যরা সবাই নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। এই ধ্বংসাত্মক হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘নতুন রিক্রুটদের লক্ষ্যবস্তু করা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, কোণঠাসা ও চাপে পড়লে হুথি মিলিশিয়ারা শেষ পর্যন্ত সন্ত্রাসী হামলার পথ বেছে নেয়।’
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে শুরু থেকেই সমর্থন জুগিয়ে আসছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। সম্প্রতি হুথিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর পাল্টাপাল্টি সামরিক সংঘাত মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালির নিকটবর্তী ভূখণ্ডের দিকে হুথিরা নতুন করে অগ্রসর হওয়ার পর থেকে অঞ্চলে উত্তেজনা চরম মাত্রায় পৌঁছায়।
দক্ষিণ-মধ্য ইয়েমেনের উপকূলীয় জেলা শাবওয়া কৌশলগত ও জ্বালানি সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এডেন উপসাগরের তীরবর্তী এই প্রদেশেই অবস্থান করছে ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও শিল্প বিনিয়োগ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ‘বালহাফ’।
এদিকে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় আল আলম শিবিরে হামলা চালানোর দায় স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি মূলত সৌদি বাহিনী পরিচালনা করত। যদিও এই বিষয়ে কোনো বক্তব্য জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে দেশটির কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
হুথিদের দখলে থাকা ভূখণ্ডগুলো পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে চলতি মাসেই সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী। ইতোমধ্যে বাব আল মানদেব প্রণালির কাছের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা তারা পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় হুথি বিরোধী বাহিনীর সর্বশেষ প্রধান নগর ঘাঁটি ‘তাইজ’ চতুর্দিক থেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে হুথিরা।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান প্রক্সি যুদ্ধ ও সংঘাতের একটি নতুন ও বিপজ্জনক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে ইয়েমেন। ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবেও হামলা বাড়িয়েছে হুথিরা, যার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘সৌদি আরামকো’।
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে দক্ষিণাঞ্চলে তাড়িয়ে দিলে ইয়েমেনে পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর সামরিক হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হয়। অবশেষে ২০২২ সালে দুই পক্ষ জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, যা চলতি বছর পর্যন্ত কার্যকর ছিল।
যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে ইয়েমেন ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে। নতুন করে সহিংস সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় দেশটির সার্বিক মানবিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে বলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা ও রয়টার্স


