আমার নেতৃত্বে বিশ্ব ভালো আছে, জাতিসংঘের ভাষণে বলবেন ট্রাম্প

আমার নেতৃত্বে বিশ্ব ভালো আছে, জাতিসংঘের ভাষণে বলবেন ট্রাম্প
২০২৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন ট্রাম্প। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

নানা বৈশ্বিক সংকট ও দ্বিতীয় মেয়াদে অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে তার ভাষণে ইরান যুদ্ধ, গ্রিনল্যান্ড চুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গুরুত্ব পাবে।

বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক অর্থনীতি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামাজিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘে আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় সংস্থাটির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বিশ্বনেতাদের বার্ষিক সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার পর ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

এ ছাড়া তিনি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশ বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতা এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকে ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং সৌদি আরবে ইয়েমেনের ইরানের সমর্থিত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা নিয়ে আলোচনা হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প এমন সময়ে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন, যখন ইরান যুদ্ধ ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে তার পররাষ্ট্রনীতির ধরন আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রচেষ্টায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে বিশ্ব আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে- এটিই তিনি ভাষণে তুলে ধরবেন।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দূত মাইক ওয়াল্টজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আশা করছি, প্রেসিডেন্ট তুলে ধরবেন কীভাবে তিনি এবং তার প্রশাসন বিশ্বজুড়ে জটিল সমস্যাগুলোর মোকাবিলা করেছেন।’

ওয়াল্টজ ইঙ্গিত দিয়েছেন, ট্রাম্প জাতিসংঘ নিয়ে তার দীর্ঘদিনের সমালোচনার বিষয়গুলোও আবার সামনে আনতে পারেন। এর আগে যুদ্ধ ও শান্তির মতো বিষয়ে জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর’ বলে সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়াকে ‘প্রতারণা’ বলেও মন্তব্য করেছেন এবং দাবি করেছেন, ইউরোপের বাসিন্দাদের ওপর অভিবাসীদের ‘আক্রমণ’ জাতিসংঘ উৎসাহিত করছে।

ইরান যুদ্ধ এবারও ট্রাম্পের ভাষণের বড় অংশজুড়ে থাকতে পারে। গত বছরের জাতিসংঘ ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা ‘ধ্বংস’ করেছে। এবার ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর প্রায় সাত মাস পর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ফিরছেন। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলায় এই যুদ্ধ প্রয়োজন ছিল।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ নেতাদের বড় অংশ নিহত হয়েছে এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ দেশটির অর্থনীতিকে ব্যাপক সংকটে ফেলেছে।

তবে যুদ্ধ আরও জটিল আকার নিয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে। হরমুজ প্রণালিতে কার্যত অচলাবস্থার মধ্যেই সম্প্রতি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব-আল মান্দেবে হুথিদের প্রতিরোধ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জাহাজে করে তেল পরিবহন মারাত্মক বাধাগ্রস্ত করছে।

এর জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে দাম ছিল ৭০ ডলারের ঘরে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সোমবার বলেন, কাতারসহ মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘গভীর আস্থার সংকট’ দূর করার চেষ্টা করছে এবং তারা দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে চায়।

তিনি কনকর্ডিয়া বার্ষিক সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট বলতে চাই, এটি (ইরান যুদ্ধ) শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই শেষ হবে। আমরা এখন চুক্তি করতে পারি অথবা ১০ মাস পরও করতে পারি। পার্থক্য শুধু হবে মৃতের সংখ্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণে।’

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্প প্রশাসন ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গেও একটি চুক্তিতে সই করবে। এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর পথ তৈরি হবে।

চুক্তি অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের ভূখণ্ড হিসেবেই থাকবে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন দেশটির সম্প্রচারমাধ্যম টিভি টু ডেনমার্ককে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠকের অপেক্ষায় আছি। আমি মনে করি, আমরা একটি ভালো চুক্তিতে পৌঁছেছি।’

ট্রাম্প তার ভাষণে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও কথা বলতে পারেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি বলেছিলেন, দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই এই যুদ্ধের সমাধান করবেন। তবে সেই যুদ্ধের বিষয়ে তিনি নিয়মিত হতাশা প্রকাশ করেছেন। ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারে হামলা এবং রাশিয়ার ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে তেল বাজারে অস্থিরতা বাড়ায় ট্রাম্প অসন্তোষ জানিয়েছেন।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তার উদ্যোগে দুই পক্ষই একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া মেনে চললে তিনি এই পরিকল্পনায় রাজি আছেন। তবে রাশিয়া জানিয়েছে, মস্কোর ওপর পশ্চিমা জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে তারা এই প্রস্তাবে রাজি হবে না।

এরপরও দুই পক্ষ ক্রমাগত তেল শোধনাগারসহ বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে রাশিয়া দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের ডিজেল তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘এই হাস্যকর ও কখনো শেষ না হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধ অবশ্যই শেষ করতে হবে।’

জাতিসংঘ সফরের সময় ট্রাম্প যুক্তরাজ্য, জাপান ও ভেনেজুয়েলার নেতাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করবেন।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সঙ্গে এটি হবে ট্রাম্পের প্রথম সরাসরি বৈঠক। বার্নহ্যাম জুলাইয়ে মধ্য-বামপন্থি লেবার পার্টির নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হন।

তেলের উচ্চমূল্যের কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়ায় ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার উপায় নিয়েও আলোচনা করতে পারেন। সোমবার তিনি জানান, হুতি বিদ্রোহীদের হামলা প্রতিহত করতে সৌদি আরবকে সহায়তার জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর একটি বিমান পাঠানো হবে। বিমানটি ‘প্রতিরক্ষামূলক’ অভিযানে সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করবে।

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হবে দুই নেতার প্রথম সাক্ষাৎ। গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিয়ে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসার পর এই বৈঠক হচ্ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad