লুটপাটে জেরবার ঢাকা জেলা পরিষদ: তদন্ত শুরু

লুটপাটে জেরবার ঢাকা জেলা পরিষদ: তদন্ত শুরু
Advertisement
Advertisement

ঢাকা জেলা পরিষদে গত এক যুগে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র বের হয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি খাতে অনিয়মই ছিল নিয়ম। অস্তিত্বহীন স্কুলের নামে প্রকল্প, ভুয়া বিল, গাড়ি মেরামত, মসজিদ সংস্কার, দুস্থভাতা ও নামসর্বস্ব প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। বেদখল হয়েছে জেলা পরিষদের কয়েকশ’ কোটি টাকার জমি।

টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে আসা বিভিন্ন নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এই লুটপাটের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে বর্তমানে তদন্ত শুরু হয়েছে।

ঢাকা জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক মো. ইয়াছিন ফেরদৌস মোরাদ জানান, ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক দুইজন প্রশাসক এবং কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন। তাদের মাধ্যমেই এই বিপুল অর্থের দুর্নীতি হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে সকল প্রকল্পের ফাইল পর্যালোচনা করা হচ্ছে। শিগগিরই দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা দেওয়া হবে।

অস্তিত্বহীন স্কুলেও কোটি টাকা বরাদ্দ

কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের কৈবর্তপাড়া এলাকায় একটি স্কুল নির্মাণের জন্য ২০২২ সালে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সেই স্কুলের নামে দুই অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয় মোট এক কোটি ১০ লাখ টাকা।

ধামরাইয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আওয়াল ট্রেডার্স কাজ শেষ হয়েছে দাবি করে বিল নিতে গেলে ধরা পড়ে জালিয়াতি। কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিনাত ফৌজিয়া তদন্ত করে জানান, ওই এলাকায় কোনো সরকারি স্কুলের অস্তিত্বই নেই।

ঠিকাদার মোহাম্মদ আওয়াল জানান, অন্য একজন তার লাইসেন্স ব্যবহার করে এই কার্যাদেশ নিয়েছিলেন। এই প্রকল্পের নেপথ্যে তৎকালীন সংসদ সদস্য নসরুল হামিদ বিপুর ভূমিকা ছিল বলে জানা গেছে। তবে তিনি আত্মগোপনে থাকায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গাড়ি মেরামতে অস্বাভাবিক ব্যয়

২০১৭ সালে প্রায় ৯১ লাখ টাকা দিয়ে জেলা পরিষদের জন্য একটি পাজেরো জিপ গাড়ি কেনা হয়। গাড়িটি কেনার মাত্র দুই মাস পর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৭৬ বার মেরামতের নামে ২৯ লাখ ৪০ হাজার ৩৩৩ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবর মাসে এক দিনেই ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

এই অস্বাভাবিক ব্যয়ে সন্দেহ হলে পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম র‍্যাংগস ওয়ার্কশপের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দেন। ওয়ার্কশপের জেনারেল ম্যানেজার সাঈদ চৌধুরী জানান, তারা প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেছেন। অবশ্য তার দাবি, নতুন গাড়িতেও অনেক সময় নানা রকম মেরামতের দরকার হয়।

অন্যদিকে, পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান সরকারি চালক থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত চালক দিয়ে গাড়িটি ব্যবহার করেছেন। সরকারি চালক জমির উদ্দিন গাড়ি না চালিয়েই বেতন তুলেছেন। সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বর্তমানে কারাগারে আছেন।

শত কোটি টাকার সম্পত্তি দখল

আরও পড়ুন

কাটাবন এলাকায় জেলা পরিষদের শত কোটি টাকা মূল্যের ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার লোকমান হোসেন জানান, জায়গাটির দাম বর্তমান বাজারমূল্য শত কোটি টাকা। জায়গাটি ফেরত চেয়ে কয়েক দফা চিঠি দিলেও ডিএসসিসি কোনো সাড়া দেয়নি।

এ ছাড়া খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকায় জেলা পরিষদের একটি মার্কেটের ৭২টি দোকান গুঁড়িয়ে দিয়েছে ডিএসসিসি। এ ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দাবি করে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডিএসসিসি’কে চিঠি দিয়েও সাড়া পাননি।

একইভাবে ২০১৫ সালে মোহাম্মদপুরে জেলা পরিষদের জায়গায় তৈরি একটি কনভেনশন সেন্টার দখলে নেয় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি)। এছাড়া গাবতলী গরুর হাটের জমি ও ইজারার টাকা নিয়েও ডিএনসিসি সঙ্গে জেলা পরিষদের বিরোধ চলছে।

এ বিষয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, গাবতলী, মোহাম্মদপুর ও কাটাবনের সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে সিটি কর্পোরেশন। অবশ্য জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে এসব সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে বলে জানান শফিকুল ইসলাম খান।

অন্যদিকে ঢাকা জেলা প্রশাসক ইয়াছিন ফেরদৌস মোরাদ বলেছেন, সম্পত্তি উদ্ধারে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান হতে হবে।

মসজিদ ও সংস্কারের নামে লুটপাট

ধামরাইয়ের সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদের গ্রাম বৈণ্যায় ১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে তিন  কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে শুধু মসজিদের উন্নয়নেই বরাদ্দ ছিল দুই কোটি ৮৬ লাখ টাকারও বেশি। তবে মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন জানান, মাত্র দেড় কোটি টাকার কাজ করে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, পুরান ঢাকার জনসন রোডে নতুন ভবন নির্মাণকাজ চলায় ঢাকা জেলা পরিষদের দাপ্তরিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের আজমপুর এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিষদ চেয়ারম্যানের অব্যবহৃত বাসভবনটিকেই এই অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

সেই বাসভবন সংস্কার এবং কক্ষগুলোর অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার জন্য ঢাকার কলাবাগানের ‘অনেস্ট্রা লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটিকে প্রথমে ৭০ লাখ ৪৬ হাজার টাকার দুটি এবং পরে আরও ৩৬ লাখ ৭৪ হাজার ৬৩১ টাকার একটি কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে মোট এক কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার ৬৩১ টাকার কাজের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, এত বিপুল অংকের টাকা খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে কোনো কাজই করা হয়নি।

গত ৬ এপ্রিল ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে এই অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে একটি চিঠি দেন জেলা পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়ারেছ আনসারী। ওই চিঠিতে  তিনি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি অসম্পূর্ণ এই কাজের সঠিক হিসাব বা যৌথ পরিমাপ করার জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের আবেদনও করেছেন।

অনুমোদনহীন বহুতল ভবন

পুরান ঢাকার জনসন রোডে রাজউক ও ফায়ার সার্ভিসসহ কোনো সংস্থার ছাড়পত্র ছাড়াই ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ২০ তলা ভবন নির্মাণ শুরু হয়। মেসার্স তমা কনস্ট্রাকশন কাজ শেষ না করেই ৮ দফায় প্রায় ৯৮ কোটি টাকা বিল তুলে নিয়েছে। বর্তমানে কাজ বন্ধ থাকায় স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রতিকার চেয়ে চিঠি দিয়েছেন পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন খন্দকার।

তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক পলাতক থাকায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জালিয়াতি ও অন্যান্য অনিয়ম

গাবতলী এলাকায় ৯২ শতাংশ জমির ইজারা বন্ধ রাখতে অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজলের নামে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। তবে ডিপজল জানিয়েছেন, তিনি এ ধরনের কোনো রিট করেননি। কেউ জালিয়াতি করে তার নাম ব্যবহার করেছে।

এ ছাড়া ২০১৪ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিনের দেওয়া দুস্থভাতার ৫ লাখ টাকার একটি বড় অংশ পরিষদের কর্মচারীরা ভাগ করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তদন্ত ও ব্যবস্থা

বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন সময়ে ঢাকা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন মাহবুবুর রহমান, হাসিনা দৌলাসহ আরও কয়েকজন। তাদের সময়কালেই এসব অনিয়ম শিকড় গেড়েছে। দুদক ইতিমধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান হাসিনা দৌলা এবং বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া এমন দুর্নীতি ও অনিয়ম সম্ভব নয়। ঢাকা জেলা পরিষদে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর