আসন্ন মে মাসের শুরুতেই দেশে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিতে পারে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে থাকবে, ঠিক তখনই জ্বালানি সংকটের কারণে বিশেষ করে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এর মূল কারণ হলো তীব্র তাপপ্রবাহ, কৃষিকাজে সেচের আধিক্য এবং অফিস ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির ব্যবহার বৃদ্ধি।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী মে মাসের শুরুর দিকে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানান, মূল চাহিদার বাইরে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই কেন্দ্রগুলোই এখন সবচাইতে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
তিনি বলেন, এই কেন্দ্রগুলো ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। তবে বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুদ আছে তা বড়জোর এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে।
ডেভিড হাসনাত আরও জানান, গত সাত-আট মাস ধরে বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করায় বেসরকারি অপারেটররা নতুন করে জ্বালানি আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারছে না। এলসি খোলা না গেলে নতুন কোনো তেল দেশে আসবে না।
তিনি বলেন, যদি এখনই সব পাওনা পরিশোধ করে দেওয়া হয়, তবুও নতুন জ্বালানি দেশে পৌঁছাতে কমপক্ষে ৪০ দিন সময় লাগবে। এর ফলে এপ্রিলের শেষ বা মে মাসের শুরুতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে, যা সরাসরি লোডশেডিংয়ের কারণ হবে।
তিনি বলেন, দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলে সেই বাড়তি চাহিদা মূলত এই তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোই পূরণ করে। যদি তেল না থাকে তবে ওই অতিরিক্ত চাহিদার পুরো অংশটিই লোডশেডিং হিসেবে দেখা দেবে। নতুন জ্বালানি আসার আগ পর্যন্ত অন্তত ১০ দিন দেশবাসীকে তীব্র ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে।
জ্বালানি খাতের অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। তবে রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি সংকট এবং পরিচালনাগত অদক্ষতার কারণে প্রকৃত উৎপাদন অনেক কম। তাদের মতে, বর্তমান কার্যকর উৎপাদন ক্ষমতা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। যদিও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড ১৬ হাজার মেগাওয়াটের সামান্য কিছু বেশি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, গত ১০ দিনে বেসরকারি অপারেটরদের কিছু বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। তবে আগের বকেয়া নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমানে জ্বালানির মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুপারিশের বিষয়েও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থাপিত ক্ষমতা এবং প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যকার সম্পর্কটি বেশ জটিল। একে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নির্দিষ্ট চুক্তির আওতায় চলে। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস বা রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো ভিন্ন ভিন্নভাবে হিসাব করা হয়।
তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশেষ করে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে গেলে এক হাজার থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে।
ইজাজ হোসেনের মতে, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ব্যাকআপ এবং পিক-আওয়ারের চাহিদা মেটাতে অপরিহার্য। এগুলোকে অন্য কোনো উৎস দিয়ে সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম জানান, গ্যাস ও তেলের সরবরাহ সংকটে ইতোমধ্যেই উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো উচিত।
তিনি বলেন, কাগজে-কলমে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট। তবে পুরনো কেন্দ্রগুলোর কারণে প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা অনেক কম। তার মতে, সব রকম অনুকূল পরিস্থিতিতেও ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা বেশ কঠিন।
ম. তামিম মনে করেন, গ্রীষ্মের পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। অথচ উৎপাদন সীমাবদ্ধ থাকতে পারে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। এই বিশাল ঘাটতির ফলে অনিবার্যভাবে লোডশেডিং বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, নবায়নযোগ্য শক্তি স্বল্প মেয়াদে খুব একটা স্বস্তি দিতে পারছে না। কারণ বর্তমানে সৌরশক্তি থেকে দিনে মাত্র এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ব্যয়বহুল তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে এর ব্যাপক সম্প্রসারণ প্রয়োজন।


