দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বাস্তবায়নের সরকারি প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা অনেকটাই অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া হাজার হাজার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু কোনো ধরনের অর্থবহ সহায়তা পাচ্ছে না, যা সরকারের এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের সদিচ্ছাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে সারা দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অন্তত এক লাখ দুই হাজার ৬৫৬ জন প্রতিবন্ধী বা বিশেষ শিখন চাহিদাসম্পন্ন শিশু পড়াশোনা করছে। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
প্রাথমিক স্তরে এমন বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী থাকলেও তাদের জন্য নেই কোনো প্রশিক্ষিত শিক্ষক, বিশেষায়িত পাঠদান পদ্ধতি কিংবা প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ। এই সহায়তাহীন পরিবেশে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জরুরি হস্তক্ষেপ না করলে এই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারার সমাজে একীভূত করার ওপর জোর দিয়ে তাদের শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, গত দেড় দশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে খুব কমই বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা ব্রেইল পদ্ধতি, ইশারা ভাষা কিংবা বিশেষ সরঞ্জামের সুবিধা ছাড়াই ক্লাসে অংশ নিচ্ছে। এই শিশুরা শ্রেণিকক্ষে আসলে কী শিখছে বা বিশেষ সহায়তা ছাড়া পাঠদান কীভাবে অনুসরণ করছে, তা বড় এক প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, এই নামমাত্র শিক্ষা তাদের উচ্চতর শিক্ষার স্তরে পৌঁছাতে খুব একটা সাহায্য করবে না।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার এই বেহাল দশা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ক পরামর্শক কমিটির প্রধান অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষানীতি মূলত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি জানান, বাস্তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। প্রতিবন্ধিতার অনেক ধরন ও স্তর থাকলেও বাংলাদেশে তা শনাক্ত করার কোনো সঠিক পদ্ধতি পর্যন্ত নেই। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য যে বিশেষ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার অভাব স্পষ্ট।
অধ্যাপক মনজুর আহমদ আরও বলেন, অনেক প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা ও কাউন্সেলিং প্রয়োজন হয়, যা বর্তমানে প্রায় অনুপস্থিত। এ ছাড়া সব শিশুকে মূলধারার বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত করা সবসময় ফলপ্রসূ হয় না বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী অনেকের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, কেবল সাধারণ স্কুলে ভর্তি করলেই তাদের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হওয়া এক লাখ দুই হাজার ৬৫৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৭ হাজার ৬৮৯ জন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তাদের মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী ১৬ হাজার ৯৭৩ জন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৪ হাজার ৬৩০ জন, শ্রবণপ্রতিবন্ধী এক হাজার ৩৪৮ জন এবং বাকপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে ছয় হাজার ৬৪৪ জন। সবচেয়ে বড় অংশটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী, যাদের সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৫ জন। এ ছাড়া অটিজম আক্রান্ত এক হাজার ৩৮৮ জন, শিখন প্রতিবন্ধী এক হাজার ৬১৫ জন এবং অন্যান্য ধরনের প্রতিবন্ধী রয়েছে এক হাজার ১৬ জন।
বিশেষায়িত উপকরণের অভাব সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সব ধরনের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ভর্তি নেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, মূলধারার স্কুলে একীভূত করলে তারা স্বাভাবিক সামাজিক জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টো।
গাইবান্ধা, বগুড়া, রাঙ্গামাটি ও ঢাকার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তি নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় সক্ষমতা না থাকায় এসব শিশুদের সঠিকভাবে পড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে এই শিশুরা শ্রেণিকক্ষে অন্য শিক্ষার্থীদের বিদ্রূপের শিকার হয় এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে শেষ পর্যন্ত স্কুল ছেড়ে দেয়।
ঢাকার গেন্ডারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রিয়াজ পারভেজ জানান, তার স্কুলে মৃদু প্রতিবন্ধিতা থাকা কিছু শিশু পড়াশোনা করছে। তবে তারা অন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশ পিছিয়ে থাকছে। তিনি মনে করেন, বাক, শ্রবণ বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা প্রকট, তাদের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই তালে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব।
সরকারের পক্ষ থেকেও এ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান টাইমস’কে বলেন, সরকারি উদ্যোগ এখন পর্যন্ত সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। তবে তারা শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ৩২ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে র্যাম্প সুবিধা নিশ্চিত করেছেন। অন্যান্য প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নরসিংদী ও সিরাজগঞ্জের তিনটি উপজেলায় একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় পাইলট প্রোগ্রাম চলছে। এছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়নে অধিদপ্তরে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে তিনি মনে করেন, গুরুতর প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ে আসার আগে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে এবং জটিল চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করা বেশি কার্যকর হতে পারে।


