সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ‘৩১ দফা’ কর্মসূচির আলোকে নির্বাচনী ইশতেহারের খসড়া তৈরি করছে বিএনপি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এই দলিলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠন, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংস্কার এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক নির্দেশনাসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো একত্রিত করা হয়েছে।
বিএনপি জানিয়েছে, ক্ষমতায় গেলে তারা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নীতি ও আদর্শের নির্দেশনায় বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে চায়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ইশতেহার তৈরির কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এটি ঘোষণা করা হবে।
দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে এই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কী থাকছে ইশতেহারে
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান বলেন, সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ৩১ দফার কাঠামোর মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তিনি জানান, তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকবে সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কার, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোটদান, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা, বাকস্বাধীনতা, স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার।
দলীয় সূত্র মতে, ইশতেহারে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণ স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মাদকাসক্তি ও ভূমি দখল রোধ এবং নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকবে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচির উত্তরাধিকার ধরে রেখে, ইশতেহারে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার ঘোষণা দেওয়া হবে।
এই পরিকল্পনার আওতায় সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এর পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর সবুজায়ন অভিযান চালানো হবে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো জলাবদ্ধতা নিরসন করা, পরিবেশ রক্ষা করা এবং নগর জীবনের অবস্থার উন্নতি ঘটানো।
কৃষি খাতে ইশতেহারে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ, কৃষি উপকরণের দাম কমানো, কৃষকদের জন্য ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং ধান ও চাল সংগ্রহের একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সারা দেশে এক কোটি পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, কৃষক কার্ড প্রবর্তন এবং জলবায়ু ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে হেলথ কার্ড প্রবর্তন, ইউনিয়নভিত্তিক কমিউনিটি সেন্টার স্থাপন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে বিএনপি, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই হবে নারী।
ইশতেহারে বিভাগীয় শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে মেডিকেল কলেজ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে দলটি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে মানসম্মত শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বন্ধ করা এবং নীতিনির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে নাগরিক পরিষদ গঠনের অঙ্গীকার করেছে।
ইশতেহারে ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কওমি মাদ্রাসার উন্নয়ন, একটি ইসলামি গবেষণা তহবিল গঠন, ধর্মীয় শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় চর্চার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা।
সংখ্যালঘুদের ভূমি দখল রোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, নিরাপত্তা সেল এবং ধর্মীয় উৎসবের সময় রাষ্ট্রীয় সহায়তারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে ইশতেহারে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্টার্ট-আপ ফান্ড গঠন, আইটি প্রশিক্ষণের বিস্তার, নতুন বিদেশি শ্রমবাজার উন্মোচন এবং একটি মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স গঠনের রূপরেখা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দলিলটিতে নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ, নারী উদ্যোক্তা তহবিল, উচ্চতর মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং নারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধ ও ভুক্তভোগীদের বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের অঙ্গীকারও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


