ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হইচইয়ের মধ্যে অন্তত ১৪ হাজার সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় ৬৯ হাজার প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। অল্প সময়ের এতসংখ্যক পরীক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে দ্রুত এই বিপুল পরিমাণ শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ করার পাঁয়তারা করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। নির্বাচনের পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকের জায়গা পরিবর্তন হতে পারে বলে দ্রুত এই নিয়োগ সম্পন্ন করতে চাচ্ছেন তারা। এ কারণে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছেন তারা।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নুর মো. শামসুজ্জামান। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত। নির্বাচন চলাকালেও সব দেশেই স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকে। এটি তেমনই একটি বিষয়।’
এবার মৌখিক পরীক্ষায় যেসব পরিবর্তন আসছে
এবার এবার লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৮০ থেকে বাড়িয়ে ৯০ করা হয়েছে। ভাইভার নম্বর ২০ থেকে কমিয়ে ১০ করা হয়েছে। এ ছাড়া, ভাইভা বোর্ডে সার্টিফিকেট প্রদর্শনের জন্য আগে নম্বর থাকলেও এবার নম্বর রাখা হয়নি। আগে ভাইভাবে আলাদাভাবে পাস-ফেল করানোর প্রথা না থাকলেও এবার ভাইভাতে পৃথকভাবে পাস-ফেল করানোর পদ্ধতি রাখা হচ্ছে।
এ ছাড়াও দেশের ৬১ জেলায় আয়োজিত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ভাইভা বোর্ডে ডিসিদের সভাপতি এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের সদস্য সচিব হিসেবে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি জেলায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তাকেও ভাইভা বোর্ডে রাখা হচ্ছে।
কিন্তু, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ায় প্রার্থীদের আচরণবিধি সংক্রান্ত ইস্যু থেকে শুরু করে নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে জেলাপ্রশাসকরা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে তাদের ভাইভা বোর্ডে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা কম। ফলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা নিজেদের মতো করে মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারবেন। ফলে নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যেই নিয়োগ সম্পন্নের প্রচেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রেই কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে আবু নুর মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘পরীক্ষার প্রক্রিয়া ও নম্বর বিভাজনের বিষয়গুলো শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুসারে করা হয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এসব বিধিমালা করা হয়। এই সিদ্ধান্ত অধিদপ্তর একা নিতে পারে না।’
ডিসিদের সঙ্গে কথা বলেই ভাইভা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মহাপরিচালক। তিনি আরও বলেন, ‘ব্যস্ততার কারণে কোনো ডিসি ভাইভা নিতে না পারলে ভাইভা বোর্ডে তার প্রতিনিধি হিসেবে এডিসি এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) থাকবেন।’
পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, ডিভাইসের দৌরাত্ম্য
গত ৯ জানুয়ারি দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ৬১ জেলায় ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্যপদের বিপরীতে ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষার সময় ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগে ভোলা, বরিশাল, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় অন্তত চার শতাধিক পরীক্ষার্থীকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
একই সঙ্গে পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নফাঁস হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি পরীক্ষার পর প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে প্রায় কয়েক হাজার পরীক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ঘেরাও করেন। সে সময় প্রশ্নফাঁসের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে পরীক্ষা বাতিল করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তবে পরবর্তীতে প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি নাকচ করে দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর।
এরপর ২১ জানুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদের লিখিত পরীক্ষায় ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করে ফলাফল ঘোষণা করা হয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তাদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর।


