খাগড়াছড়িতে ‘অনির্দিষ্টকালের’ অবরোধের ভেতর সোমবার ‘জুম্ম ছাত্র-জনতার’ পক্ষ থেকে ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল নির্দিষ্ট আট দফা নিয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। পরে এক প্রেস বিবৃতিতে এসব তথ্য জানায় ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’।
প্রশাসন মৌখিকভাবে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার বাদে বাকি সব দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছে; পাশাপাশি হয়রানি ও গ্রেপ্তার বন্ধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।
জুম্ম ছাত্র-জনতা দাবি, ‘প্রশাসন ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছে তারা। এ আলোচনার মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপের সূচনা হয়েছে, যা আমরা স্বাগত জানাই; তবে এটি আমাদের অধিকার ও আন্দোলনকে নিছক কথায় গৃহীত হতে দেবে না।’
এছাড়া বৈঠকে খাগড়াছড়িতে সংঘর্ষে তিনজন নিহত ও ‘ছয়জন নিখোঁজ’ এবং বহু ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি পুড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’। হতাহতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করলেও কথিত ‘নিখোঁজ ছয়জনের’ পরিচয় জানায়নি সংগঠনটি।
সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি, জুম্ম ছাত্র-জনতা কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীও নয়। আমাদের আন্দোলনকে “ইউপিডিএফ” বা অন্য কোনো ট্যাগ দিয়ে দমন করা যাবে না। ২৩ সেপ্টেম্বর এক জুম্ম কিশোরীর ওপর ধর্ষণের ন্যায়বিচারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, যা প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার। তবে ২৭ সেপ্টেম্বর অবৈধ সেটেলার কর্তৃক চালানো সাম্প্রদায়িক হামলা এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গুইমারায় সেনাবাহিনীর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়; এগুলো বর্বর ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড। সেটেলারদের দ্বারা ঘরবাড়ি, দোকান ও যানবাহনে আগুন দেওয়া, লুটপাট, এবং নির্বিচার গুলির ফলে তিনজন শহীদ হয়েছেন ও বহু নিরীহ মানুষ আহত হয়েছেন। আমরা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে “গুইমারা – ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ গণহত্যা” হিসেবে ঘোষণা করছি এবং নিহতদের শহীদ হিসেবে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।’
ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে দ্রুত আইনি বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছে তারা।
প্রেস বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘রাষ্ট্রীয় বাহিনী এ দায় এড়াতে পারে না। প্রশাসন যদি আমাদের শান্তিপূর্ণ দাবি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়, অথবা সেনাবাহিনী, সেটেলার বা অন্য কোনো বাহিনী আমাদের জনগণের ওপর হয়রানি, গ্রেপ্তার, বাড়ি-ঘর তল্লাশি, হুমকি ও সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধ না করে, তবে জুম্ম ছাত্র-জনতা কঠোরতম কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। আমরা পুনরায় বলছি- আমাদের আন্দোলন আইনি, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায্য।’
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১. আলোচনার সময়কাল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময় পর্যন্ত যেকোনো ধরনের হামলা, গ্রেপ্তার, লাঠিচার্জ বা সাম্প্রদায়িক আক্রমণ বন্ধ রাখা প্রশাসন আইনগতভাবে বাধ্য থাকবে।
২. ধর্ষণ মামলার অবশিষ্ট দুই আসামিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আওতায় আনা হবে; ইতোমধ্যে আটক আসামির দ্রুত বিচার কার্যকর করে সরকারি গেজেটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে; ভুক্তভোগীকে যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দিতে হবে।
৩. ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গুলিবর্ষণের বিষয়ে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে; এই তদন্ত প্রতিবেদন আমাদেরকে সর্বোচ্চ দশ দিনের মধ্যে প্রদান করতে হবে।
৪. নিরীহ জনগণের ওপর সংঘটিত হামলা ও অগ্নিসংযোগে সৃষ্ট ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে; আহতদের চিকিৎসা-ব্যয় জেলা/রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বহন করবে।
৫. শান্তিপূর্ণ অবরোধ ভাঙতে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করলে বা অনুপ্রবেশ করে আঘাত করলে তৎক্ষণাৎ মামলা ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৬. আন্দোলন সংশ্লিষ্ট সকল আটককৃতকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে; ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর সংঘটিত হামলার বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
৭. সেনাবাহিনী ও সেটলার কর্তৃক নিহত পরিবারে ২০ লাখ টাকা, গুরুতর আহতদের ১০ লাখ ও সাধারণ আহতদের ২ লাখ টাকা এবং বাড়ি-ঘর, দোকান-পাত ক্ষতিগ্রস্তদের ৫ লাখ টাকা আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
প্রেস বিবৃতি তারা নিহত ও আহতদের পরিচয় জানিয়েছে। নিহতরা হলেন-থোয়াইচিং মারমা (২৫), আখ্র মারমা (২৪) ও আথুইপ্রু মারমা (২৬)।
আহতরা হলেন–উহলাপ্রু মারমা (২৭), রুইউ মারমা (৩৪), রাজু মারমা (২২), ক্যজচাই মারমা (২৯), জুয়েল চাকমা (২৩), কংচাইহ্লা মারমা (২৭), ক্যচাই (৩৭), উমেহ্লা মারমা (১৩), আনুমা মারমা (২১), কংজরী মারমা (৬০), চিংসা মারমা (২০), ক্যসে মারমা, অংথোয়াই মারমা, অং মারমা (২৬), বিকাশ ত্রিপুরা (২৩) ও আবাইমা মারমা (৭০)।
এ ছাড়া, ইতোমধ্যে প্রশাসনকে এই ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ও পুড়িয়ে দেওয়া সম্পত্তির বিবরণ করা হয়েছে এবং সেগুলোর পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দাবি করেছে সংগঠনটি।
এর আগে রোববার পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় নিরাপত্তা বাহিনী, বাঙালি বসতি স্থাপনকারী (সেটেলার) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় গুলিবিনিময়ে অন্তত তিনজন পাহাড়ি নিহত হয়েছেন এবং ১৩ সেনা সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ১৪৪ ধারা লঙ্ঘন করে গুইমারার রামসু বাজারে দুপুরে দিকে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় দুর্বৃত্তরা কয়েকটি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এ সহিংসতার পর, ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ ফেসবুক পোস্টে তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, বান্দরবান এবং খাগড়াছড়িতে ‘অনির্দিষ্টকালের’ অবরোধ ডেকেছে। স্কুলছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে এর আগে শনিবার অবরোধ চলছিল। সে দিনও কয়েক দফা সংঘাত হয়।


