ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর দেওয়া বক্তব্যকে ‘বিভ্রান্তিমূলক ও সত্যের অপলাপ’ হিসেবে অভিহিত করেছে সংস্থাটি।
একই সঙ্গে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর নামমাত্র প্রতিপালনের মাধ্যমে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করে দলের সর্বস্তরে নারীর অন্তর্ভুক্তি দাবি করাকে একটি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি জানায়, বাস্তবতা অস্বীকার করে জামায়াতের পক্ষ থেকে গবেষণা তথ্যকে ‘অসত্য’ আখ্যায়িত করায় তারা বিস্ময় প্রকাশ করছে। তবে জামায়াতে ইসলামী প্রতিবেদনটি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করায় তাদের সাধুবাদ জানিয়েছে সংস্থাটি।
টিআইবির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, আরপিও ১৯৭২-এর ধারা ৯০খ(১)(খ)(আ) অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সকল পর্যায়ের কমিটিতে ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে তা পর্যায়ক্রমে অর্জন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে নারী সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব বিশ্লেষণে ব্যাপক ঘাটতি দেখা গেছে।
সংস্থাটি জানায়, জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৩-২৫ মেয়াদের ১৯ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই, যা আরপিওর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাদের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ২১ জন এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরায় ১২২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া দলের মোট রুকনের প্রায় ৪৩ শতাংশই নারী।
এর জবাবে টিআইবি জানায়, আরপিওতে দলে কতজন নারী কর্মী বা মজলিসে শুরায় কতজন প্রতিনিধি আছেন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি; বরং প্রতিটি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে নারীর শতাংশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে জামায়াত সেক্রেটারির এই ধরনের অপ্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্তের উল্লেখ মূল সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।
অন্যান্য রাজনৈতিক দলে এক কমিটিতেই নারীদের অন্তর্ভুক্তির চর্চা থাকলেও, জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নারীদের জন্য প্রতিটি স্তরে স্বতন্ত্র কমিটি করা হয়েছে।
টিআইবি জানায়, জামায়াতের আমির, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল বা সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো শীর্ষ নেতৃত্বে নারীদের অন্তর্ভুক্ত না করার একটি স্থায়ী চর্চা লক্ষ করা যায়। নারীদের জন্য স্বতন্ত্র কমিটি করার মাধ্যমে তাদের মূলত একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে, যা প্রকৃত রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি প্রকাশ করে না।
এ ছাড়া, দলে ৪৩ শতাংশ নারী সদস্য থাকার দাবি করলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। এ বিষয়ে জামায়াত তাদের বিবৃতিতে নীরব থেকেছে।
টিআইবি তাদের গবেষণায় উল্লেখ করে, জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা—যেমন সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে অন্য কাউকে স্বীকার না করা, আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য নীতি প্রত্যাখ্যান করা, অমুসলিমদের সদস্যপদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আলাদা শর্ত আরোপ করা এবং নারীদের পৃথক কার্যক্রম পরিচালনা—বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সংস্থাটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, জামায়াতের এ ধরনের বিবৃতির মাধ্যমে গবেষণার সত্যতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। টিআইবি জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে তাদের প্রকাশিত গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী নিজ নিজ দলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনার আহ্বান জানাচ্ছে।


