বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় ডেটা আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত কতটা ডেটানির্ভর?

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় ডেটা আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত কতটা ডেটানির্ভর?
Advertisement
Advertisement

একটি হাসপাতাল প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তথ্য তৈরি করে। কতজন রোগী অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলেন, কতজন হাসপাতালে এলেন, কতজন চিকিৎসা সম্পন্ন করলেন, কতজন নির্ধারিত সময়ে সেবা পেলেন না, কিংবা কতজন প্রথম যোগাযোগের পর আর ফিরে এলেন না—প্রতিটি তথ্যের পেছনে রয়েছে একটি সম্ভাব্য গল্প। কিন্তু এই তথ্যগুলো যদি শুধু মাসিক রিপোর্ট, এক্সেল শিট কিংবা উপস্থাপনার স্লাইডে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে হাসপাতাল কি সত্যিই ডেটার পূর্ণ মূল্য পাচ্ছে?

স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে আলোচনা সাধারণত অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট, আধুনিক সফটওয়্যার, ডিজিটাল মার্কেটিং কিংবা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করাই ডিজিটাল রূপান্তরের চূড়ান্ত সাফল্য নয়। প্রকৃত পরিবর্তন আসে তখনই, যখন তথ্য প্রতিষ্ঠানকে আরও ভালো সিদ্ধান্ত নিতে, সেবার দুর্বলতা শনাক্ত করতে এবং রোগীর অভিজ্ঞতা উন্নত করতে সাহায্য করে।

ধরা যাক, একটি হাসপাতালের ডিজিটাল মাধ্যমে অনেক রোগী যোগাযোগ করছেন। বিপণন বিভাগের রিপোর্টে যোগাযোগের সংখ্যা বাড়ছে, প্রচারণার নাগালও সন্তোষজনক। কিন্তু সেই যোগাযোগের কত অংশ অ্যাপয়েন্টমেন্টে রূপান্তরিত হচ্ছে? অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া রোগীদের কতজন বাস্তবে হাসপাতালে আসছেন? যারা আসছেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়—তথ্যের অস্পষ্টতা, যোগাযোগের বিলম্ব, সময়ের অসুবিধা, ব্যয়ের অনিশ্চয়তা, নাকি অন্য কোনো কারণ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু লিড বা যোগাযোগের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য বিচার করা অসম্পূর্ণ।

একই যুক্তি হাসপাতালের অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রোগীর অপেক্ষার সময় বাড়ছে কেন, নির্দিষ্ট সেবায় অ্যাপয়েন্টমেন্টের চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে ব্যবধান কোথায়, রোগীরা কোন পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হচ্ছেন, কিংবা চিকিৎসা-পরবর্তী যোগাযোগ কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন উৎসের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে আরও স্পষ্ট হতে পারে। তবে তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক দেখলেই কারণ নিশ্চিত হয়ে যায় না। সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজন প্রাসঙ্গিক তথ্য, প্রক্রিয়ার বাস্তব চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অভিজ্ঞতার সমন্বয়।

এখানেই অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। বিপণন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, রোগী নিবন্ধন, চিকিৎসাসেবা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার তথ্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থায় থাকলে রোগীর পুরো যাত্রা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি বিভাগ নিজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করলেও সামগ্রিক সেবাব্যবস্থায় সমস্যা থেকে যেতে পারে। তাই ডেটানির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু প্রযুক্তি কেনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়, তথ্যের মান নিশ্চিত করা এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য পরিমাপ-পদ্ধতি তৈরি করা।

এই পরিবর্তনের জন্য হাসপাতালগুলোকে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কোন তথ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাস্তব মূল্য যোগ করছে? কোন সূচক শুধু কার্যক্রমের পরিমাণ দেখাচ্ছে, আর কোনটি সেবার ফলাফল সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছে? একটি ডিজিটাল প্রচারণা কতজনের কাছে পৌঁছেছে, সেটি এক ধরনের পরিমাপ; কিন্তু সঠিক তথ্য পেয়ে কতজন উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। একইভাবে রোগীর সন্তুষ্টির স্কোর গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার সঙ্গে অভিযোগ, অপেক্ষার সময় এবং সেবাপ্রাপ্তির বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

তবে স্বাস্থ্যসেবায় ডেটার ব্যবহার নিয়ে একটি মৌলিক সতর্কতা জরুরি। রোগীর তথ্য সাধারণ ব্যবসায়িক উপাত্তের মতো নয়। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মতি, নিরাপত্তা এবং আস্থার প্রশ্ন সরাসরি জড়িত। তাই তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিমালা, সীমিত ও অনুমোদিত প্রবেশাধিকার, নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযোজ্য আইন ও নৈতিক মানদণ্ডের অনুসরণ। দক্ষতা বাড়ানোর নামে রোগীর গোপনীয়তাকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত বিশ্লেষণ প্রযুক্তি এই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করছে। তবে প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, দুর্বল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি সিদ্ধান্তও দুর্বল হতে পারে। স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির কাজ হওয়া উচিত মানুষের সিদ্ধান্তকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ করা—চিকিৎসকের বিচারবোধ, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা রোগীর ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে অগ্রাহ্য করা নয়।

 

আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল অগ্রগতির পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত ‘আরও বেশি তথ্য সংগ্রহ’ থেকে ‘আরও ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণে’ উত্তরণ। হাসপাতালগুলো যদি রোগীর যাত্রা, সেবার প্রাপ্যতা, যোগাযোগের কার্যকারিতা এবং বাস্তব ফলাফলকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করতে পারে, তাহলে ডেটা শুধু অতীতের হিসাব থাকবে না; ভবিষ্যতের উন্নতির দিকনির্দেশনাও দেবে।

স্বাস্থ্যসেবায় প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি বা প্রযুক্তির সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। প্রতিষ্ঠান কত দ্রুত নিজের দুর্বলতা শনাক্ত করতে পারে, তথ্যের ভিত্তিতে প্রক্রিয়া উন্নত করতে পারে এবং রোগীর প্রয়োজনকে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রাখতে পারে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

হাসপাতালের প্রকৃত ডিজিটাল সক্ষমতা তার কাছে কত তথ্য আছে, তাতে নয়; সেই তথ্য দিয়ে সে কতটা ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাতে।

লেখক: হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad