জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, গত জুলাইয়ে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইয়েমেনে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। হুথি বিদ্রোহী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর মধ্যে একাধিক ফ্রন্টে লড়াই এখন তুঙ্গে।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, এই বাস্তুচ্যুতি সংকটের মূল কেন্দ্রে রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনের তায়েজ শহর। নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়া মোট মানুষের ৫২ শতাংশই আশ্রয় নিয়েছে এখানে, আর এলাকা ছাড়ার দিক থেকে ৭৬ শতাংশের উৎস এই শহর।
ইউএনএইচসিআর আরও জানিয়েছে, নতুন বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যার ২৩ শতাংশকে আশ্রয় দিয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনের লাহিজ এবং ১৩ শতাংশকে আশ্রয় দিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর এডেন।
সংস্থাটি বিবৃতিতে উল্লেখ করে, ‘তায়েজে আবাসিক এলাকা ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর আশপাশসহ বিভিন্ন স্থানে গোলাবর্ষণ তীব্রতর হয়েছে। একই সময়ে প্রধান পথগুলোতে অনিরাপত্তা ও বিধিনিষেধের কারণে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো ও চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছে।’
আনসারুল্লাহ (আল্লাহর সাহায্যকারী) নামে পরিচিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা অক্টোবর মাসের শুরু থেকে তায়েজ অবরোধ করে রেখেছে। সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনের সঙ্গে সংযোগকারী সড়কটি তারা অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ম্যাথিউ সল্টমার্শ বলেন, ‘আমাদের চিহ্নিত করা সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনগুলোর মধ্যে রয়েছে আশ্রয়, খাদ্য ও বহুমুখী নগদ সহায়তা।’
সংস্থাটি জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তার তীব্র তহবিল ঘাটতির মধ্যে প্রায় ৩৩ হাজার ৭০০ পরিবারের এখনো আশ্রয়ের সহায়তা প্রয়োজন।
পৃথক এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানায়, তায়েজে ক্রমবর্ধমান লড়াই ও জ্বালানি সংকট সেখানকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই পানি ব্যবস্থার ওপর আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ নির্ভরশীল, যাদের মধ্যে অন্তত ১৬ লাখ শিশু রয়েছে।
জেনেভায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ইয়েমেনে ইউনিসেফের প্রতিনিধি নিখিল আইয়ার বলেন, ‘এমনিতেই ইয়েমেনের অন্যতম পানি-সংকটপূর্ণ এলাকা তায়েজ, যার ওপর এখন বাস্তুচ্যুত হাজারো পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে।’
সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ার ধারাবাহিকতায় এসব সতর্কতা এল।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইয়েমেনের শবওয়া গভর্নরেটের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
ইয়েমেনি সরকার এই স্থানটিকে সম্মুখসারির বাইরে অবস্থিত একটি নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছে, অন্যদিকে হুথি বাহিনী জানিয়েছে যে তারা সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। আতাক শহরে হাসপাতালগুলোতে রক্তের সংকট দেখা দিয়েছে; সেখানে চিকিৎসা দলগুলো হতাহতদের সেবা দিচ্ছে এবং নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে পরিবারগুলো হন্যে হয়ে খুঁজছে।
এই হামলার পর তায়েজের কাছে সরকারি বাহিনী পাল্টা হামলা চালায়, যা ইয়েমেনের অবনতিশীল মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজধানী সানা থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক ইউসেফ মাওরি জানান, ‘হুথিরা পিছু হটছে না। তাদের সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছে যে তারা সৌদি আরবের ভেতরের অঞ্চলগুলোতে আরও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।’
মাওরি আরও বলেন, ‘সীমান্তপারের হামলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ ইয়েমেনিরা আশঙ্কা করছে যুদ্ধ তাদের ঘরের কাছে চলে আসছে। বিশেষ করে উভয় পক্ষই যখন হামলা বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে সৌদি আরব তাদের বিমান হামলা জোরদার করছে।’
এদিকে, মঙ্গলবার ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, তাদের বাহিনী হুথিদের ১২৭টি অস্ত্রাগার ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ মঞ্চ ধ্বংস করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য জানিয়েছে যে তারা সৌদি আরবকে হুথিদের ক্রমবর্ধমান হামলা থেকে রক্ষা করতে প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের যুদ্ধবিমান মোতায়েন করবে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, টাইফুন যুদ্ধবিমানগুলো ‘প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করবে’ এবং হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো হামলা চালাবে না।
হুথিরা সৌদি সমুদ্রবন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর গত জুলাই থেকে ইয়েমেনে উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বাড়ে। গত মাসে লোহিত সাগর উপকূল বরাবর সরকারি অনুগত বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগত অঞ্চল দখল করে নিলে লড়াই আরও তীব্র রূপ নেয়।
সৌদি আরবের সমর্থনে সরকারি বাহিনী কৌশলগত এলাকা হারানোর জবাবে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’ চালুর ঘোষণা দেয়। ২০১৪ সালে হুথিদের দখলে যাওয়া সানাসহ অন্যান্য অঞ্চল পুনর্দখল করাই এই অভিযানের লক্ষ্য।


