আলবার্টার প্রাদেশিক সরকারপ্রধান ড্যানিয়েল স্মিথ রোববার হতাহতের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রাণ হারানো চার সেনাসদস্য হলেন- সৈনিক এইডান গোল্ডিং, শন ফ্যারেল ও হেইডেন লিকমার্ক এবং সার্জেন্ট মরগান ওয়ং।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়, শনিবার বিকালে কানাডার ওয়েনরাইট সামরিক ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ চলাকালে আগুনের সূত্রপাত হয়। এটি কানাডার অন্যতম ব্যস্ত সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র। প্রবল বাতাসের ঝাপটায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ঘাঁটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই আলবার্টা ও পার্শ্ববর্তী প্রদেশগুলো থেকে জরুরি উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসাকর্মী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। বিপুলসংখ্যক আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিতে আলবার্টার এডমন্টন, রেড ডিয়ার ও ক্যালগারি শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সামরিক ঘাঁটি থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এডমন্টনের রয়্যাল আলেকজান্দ্রা হাসপাতালে কর্মরত জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ওয়ারেন থার্স্ক বলেন, একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক আহত মানুষ আসায় সামরিক ঘাঁটির আশপাশের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
কানাডার জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ‘এত রোগীর চাপ সামাল দেওয়া এডমন্টন শহরের পক্ষেও কঠিন। রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে আমরা কেউই এখন তা গুনতে চাই না। এটি একটি বিপর্যয়। এমন দুর্যোগ সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ বছরে একবার ঘটে।’
এ ঘটনায় রোববার শোক জানিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দুর্ঘটনাটিকে কানাডার ভূখণ্ডে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ট্র্যাজেডি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কার্নি বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর যেসব সাহসী সদস্যকে আমরা হারিয়েছি, তাদের জন্য পুরো জাতি শোকাহত। সংকটের সময় কানাডার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়। এটাই আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং অন্যদের রক্ষা করতে রাতভর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা উদ্ধারকর্মীদেরও প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। মৃত্যুবরণ করা সেনাদের স্মরণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আহতরা সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সরকার তাদের পাশে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী কার্নি। একই সঙ্গে প্রাণ হারানো সেনাসদস্যদের শোকে কাতর সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
কার্নি বলেন, ‘যাদের আমরা হারিয়েছি, যারা আহত হয়েছেন, তারা কানাডাকে রক্ষা করার জন্য, কানাডার সেবা করার জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। এখন তাদের সেবা করার দায়িত্ব কানাডার।’
আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে কানাডার সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল ওয়েড রাটল্যান্ড এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, শনিবার ঘাঁটিতে চলমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে গ্রেনেড ও তাজা গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে আগুনের সঙ্গে এসব অস্ত্রের ব্যবহারের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাটল্যান্ড বলেন, ‘প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রশিক্ষণ এলাকার ঘাসে আগুন ধরে যায়। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। ওই সময় প্রশিক্ষণ এলাকার বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছিল।’
অস্বাভাবিক শক্তিশালী বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দিক পরিবর্তন করে প্রশিক্ষণ এলাকার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার স্থাপনার দিকে এগিয়ে যায় বলেও জানান তিনি।
দেশটির আবহাওয়া কর্তৃপক্ষ শনিবার ওই এলাকায় প্রবল বাতাস বয়ে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না- প্রশ্নের জবাবে রাটল্যান্ড বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময় আবহাওয়া নির্ধারিত নিরাপত্তা নির্দেশিকার সীমার মধ্যেই ছিল। ঘটনার জটিলতা ও হতাহতের ভয়াবহতা বিবেচনায় তদন্ত শেষ করতে অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে।
কানাডার জাতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেভিড ম্যাকগিন্টি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক ঘাঁটিতে একই ধরনের হতাহতের কোনো ঘটনার কথা আমার মনে পড়ছে না।’
বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পলিয়েভ জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেভিড ম্যাকগিন্টির সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘সবাই ওয়েনরাইটের জন্য প্রার্থনা করুন।’ একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের জরুরি নির্দেশনা মেনে চলতে এবং উদ্ধারকর্মীদের চলাচলের সুবিধার্থে সড়ক ফাঁকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
এমন এক সময়ে এই আগুনের ঘটনা ঘটল, যখন কানাডা থেকে আলবার্টা প্রদেশের বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ গণভোটের আয়োজন করছে। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের এই প্রদেশে সোমবার গণভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রাদেশিক সরকারপ্রধান ড্যানিয়েল স্মিথ রোববার জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ভোটারদের জন্য বিকল্প ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থা করেছে আলবার্টার নির্বাচন কর্তৃপক্ষ।


