অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে নয়াদিল্লিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবিত সংবাদ সম্মেলন বাতিল হয়ে গেছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ঘটনা বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। সহজ করতে পারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের পথ।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে ভারতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অনুরোধ জানানোর পরই সংবাদ সম্মেলনের এই সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। তবে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন কেন বাতিল করা হলো, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানিয়েছে, দলটি এখন নিউ ইয়র্ক, ব্রাসেলস, লন্ডন বা ইউরোপ-উত্তর আমেরিকার অন্য কোনো শহরে সংবাদ সম্মেলনের কথা ভাবছে। সেখানে শেখ হাসিনা অনলাইনে যুক্ত হতে পারেন। তবে প্রস্তাবিত সংবাদ সম্মেলন বাতিল হওয়ার কারণ নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত মাসে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা টাইমসকে বলেছিলেন, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় নয়াদিল্লিতে বিশ্ব গণমাধ্যমের সামনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার তারিখ জানাবেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই হতে পারত তার প্রথম প্রকাশ্য উপস্থিতি।
ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাও চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বলেছিলেন।
তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ‘দেশে ফিরলে আমাকে মেরে ফেলা হতে পারে, গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হতে পারে। তা সত্ত্বেও দেশের মানুষের কথা ভেবে আমাকে ফিরতেই হবে।’
আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশে ফেরার কথা ভাবছিলেন। দলের সূত্র অনুযায়ী, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে বা দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে তার দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে এই পরিকল্পনার কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।
কূটনৈতিক আলোচনা
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ভারতের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বর্তমানে দিল্লিতে রয়েছেন। আগামী সপ্তাহে তার ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ছাড়ার আগে তিনি বিএনপি সরকারের মূল চাওয়াগুলো বুঝতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। দিল্লিতে পৌঁছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা করতে গত ৬ অক্টোবর তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও দেখা করেন।
ঢাকা এখন দিল্লির সব পদক্ষেপ সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ, শেখ হাসিনাকে নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক ও সরকারি সূত্রে বলা হচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে হলে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ এবং তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দুই সরকারের মধ্যে একটি কার্যকর সমঝোতা হওয়া জরুরি।
অনিশ্চয়তায় সম্ভাব্য সফর
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল খুবই কম।
তবে হাসিনার পতনের পর দিল্লি বিএনপির মতো দলগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে পাঠানো হয়েছিল, যাকে তার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলের প্রতি একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হয়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় নতুন সরকার গঠনের পর থেকে দুই দেশই তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্টে তারেক রহমানের ভারত সফরের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা ইস্যুটি বড় জটিলতা তৈরি করায় সফরটি আর সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ঢাকা বারবার দিল্লিকে চিঠি পাঠিয়েছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে কী জবাব আসে, তা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
একটি রাজনৈতিক সূত্র জানায়, শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া ভারতের জন্য বেশ কঠিন একটি সিদ্ধান্ত হবে তা বাংলাদেশ বোঝে। তবে এর বাইরে অন্য কোনো পথও খোঁজা যেতে পারে।
সেই সূত্র আরও জানায়, ‘একটি উপায় হতে পারে—শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে রাখা হবে, কিন্তু তাকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না।’
তিনি মনে করেন, সংবাদ সম্মেলনটি বাতিল হওয়ায় তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমবে। এতে দিল্লি সফরের বিষয়টি ঢাকায় নীতিনির্ধারকদের আবার নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেবে।
তবে শুধু এই একটি ঘটনার কারণেই দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক নিশ্চিত হয়ে যায় না। যেকোনো সফরের সময় নির্ভর করবে সামগ্রিক রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বাকি সমস্যাগুলোর সমাধানের ওপর।
অমীমাংসিত মূল বিষয়
শেখ হাসিনা ইস্যু ছাড়াও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কিছু অমীমাংসিত সমস্যা রয়ে গেছে, যা সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি বিষয় অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, তাই এটি নবায়নের পাশাপাশি তিস্তা চুক্তির বিষয়েও অগ্রগতি প্রয়োজন।
তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করা এবং অন্যান্য অভিন্ন নদীর বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোও বড় বিষয়।
বাণিজ্যিক বাধাগুলোও সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি করছে। ভারতে পণ্য রপ্তানিতে নানা ধরনের বাধা এবং ভারতের দিকে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এ ছাড়া নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্যও একটি স্পষ্ট রূপরেখা দরকার। দুই দেশকেই নিশ্চিত করতে হবে যেন এক দেশের ভূখণ্ড অন্য দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি সীমান্তে বিএসএফ-এর বাড়াবাড়ি ও অবৈধভাবে মানুষ ঠেলে দেওয়ার ঘটনা সম্পর্ককে আরও তিক্ত করেছে, যা নিয়ে ঢাকা কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।
বাংলাদেশের এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা জানান, সফরটি রাজনৈতিক ও অন্যান্য মূল বিষয়গুলোতে অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করছে।
তিনি বলেন, ‘সফর হওয়া না-হওয়া অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে। শেখ হাসিনা ইস্যু ও অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে দুই সরকারের রাজনৈতিক সমঝোতাই ঠিক করবে এই সফর কবে হবে। ভারতকে অবশ্যই ইতিবাচক কথাগুলোকে কাজে পরিণত করতে হবে এবং পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সঙ্গে এগোতে হবে।’
ঢাকার জন্য শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন বাতিল হওয়া তাৎক্ষণিক চাপ কমানোর একটি বড় সুযোগ। তবে সেটি তারেক রহমানের দিল্লি সফরে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে দুই দেশ এই কূটনৈতিক সংকেতগুলোকে বাস্তবিক সমাধানের রূপ দিতে পারে কি না তার ওপর।


