দানবাক্স খুললেই মেলে কোটি কোটি টাকা। এ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা হলেও কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানের অর্থ কোথায়, কীভাবে ব্যয় হয়, তা নিয়ে তেমন আলোচনা নেই।
মসজিদ পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, দানের অর্থ রূপালী ব্যাংকের একটি হিসাবে জমা রাখা হয়। বর্তমানে ওই হিসাবে জমার পরিমাণ ১৩১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সবশেষ পাওয়া স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কার বিক্রির অর্থ যোগ হলে মোট জমা দেড়শ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
আগে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বাধীন একটি কমিটি মসজিদের অর্থ ও কার্যক্রম দেখভাল করত। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পৌরসভার মেয়র। সর্বোচ্চ ৩৫ সদস্যের কমিটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা ছিলেন।
বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তী কমিটি দায়িত্ব পালন করছে। এর আহ্বায়ক জেলা প্রশাসক, সদস্যসচিব সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
কমিটির সদস্যরা জানান, দানের অর্থ ধর্মীয় কার্যক্রম, শিক্ষা, মানবিক সহায়তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় করা হয়।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ও ইউএনও মো. কামরুল হাসান মারুফ টাইমসকে বলেন, ‘ধর্মীয় কাজে ব্যয়ের পাশাপাশি দরিদ্র শিক্ষার্থী, অসহায় ব্যক্তি ও বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগে অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা কার্যক্রমও আছে।’
মসজিদের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, মসজিদ ও মাদ্রাসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ দৈনন্দিন খরচও দানের অর্থ থেকে মেটানো হয়।
মসজিদ কমপ্লেক্সের নূরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসায় শতাধিক এতিম ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীর বিনা মূল্যে পড়াশোনা ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের শিক্ষা ও জীবনযাপনের ব্যয়ও বহন করা হয় দানের অর্থ থেকে। মসজিদ ও মাদ্রাসায় কর্মরত আছেন ৩৬ জন।
আগে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো। তবে বর্তমানে অন্য মসজিদে অনুদান দেওয়া বন্ধ রয়েছে।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে ইউএনও কামরুল হাসান মারুফ বলেন, ‘দানের অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হয়, যেখান থেকে সুদ আসে। ফতোয়া অনুযায়ী, সুদের অর্থ মসজিদের কাজে ব্যয় করার সুযোগ নেই। তাই মসজিদে অনুদান দেওয়ার কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।’
ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা
পাগলা মসজিদকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বহুতল ইসলামি কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে পরিচালনা কমিটি। প্রকল্পটির চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
কমিটির সদস্যসচিব কামরুল হাসান মারুফ জানান, পাঁচ একর জমিতে ১১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়তলা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। সেখানে একসঙ্গে কয়েক হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে। নারীদের জন্য থাকবে পৃথক স্থান। এ ছাড়া গাড়ি পার্কিং, একাডেমিক ভবন, অতিথিশালা, মাদ্রাসা ও গ্রন্থাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কমপ্লেক্সে থাকবে ১২০ ফুট উচ্চতার আলোকসজ্জিত মিনার ও স্বয়ংক্রিয় আলোর ব্যবস্থা। এটি নির্মিত হলে মসজিদের মূল ভবন ও প্রাঙ্গণ মিলিয়ে বিশেষ দিনে প্রায় ৪০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন বলে জানান তিনি।
বর্তমানে মসজিদে তিনটি নতুন নামাজের শেড, বড় পরিসরের অজুখানা ও নারীদের জন্য পৃথক ওয়াশব্লক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৪ টাকা। গত ২৭ সেপ্টেম্বর এ কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
দাতাদের মধ্যে অমুসলিমরাও
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরাও দান করেন বলে জানিয়েছেন মসজিদের দীর্ঘদিনের নৈশপ্রহরী মো. মকবুল হোসেন।
প্রায় ৩০ বছর ধরে সেখানে কাজ করছেন মকবুল। তিনি বলেন, আগে আশপাশের এলাকার মানুষই বেশি দান করতেন। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন। বিদেশিরাও দান করেন।
মকবুল হোসেন বলেন, ‘দিনের বেলায় যেমন অনেকে দান করতে আসেন, তেমনি গভীর রাতেও অনেকে গাড়ি নিয়ে এসে দানবাক্সে দান করেন।’
টাকা-পয়সা ও বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণালংকার, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলসহ বিভিন্ন সামগ্রীও দান করেন মানুষ।
বাড়ছে দানের পরিমাণ
পাগলা মসজিদে বিপুল পরিমাণ দানের বিষয়টি আলোচনায় আসে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। সে সময় আটটি দানবাক্স খুলে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ও কিছু স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়। এরপর থেকে দানের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
২০১৬ সালের শেষ দিকে প্রথমবারের মতো দানবাক্সে এক কোটি টাকার বেশি পাওয়া যায়। পরবর্তী বছরগুলোতে দানের পরিমাণ আরও বেড়েছে। বর্তমানে মসজিদে দানবাক্স রয়েছে ১৩টি।
সবশেষ গত ২৭ জুন দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর পাওয়া যায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। একই বছরের ১২ এপ্রিল পাওয়া যায় ৯ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৬৮৭ টাকা।
২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন বছরে মোট ১১ বার দানবাক্স খোলা হয়। এ সময় পাওয়া যায় ৫৬ কোটি ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৬৬০ টাকা।
মসজিদের সাধারণ দানবাক্স চার থেকে আট মাস পরপর খোলা হয়। তবে অলঙ্কার জমা রাখার বাক্স খোলা হয় পাঁচ থেকে ছয় বছর পরপর।
২০২০ সালের মার্চে অলঙ্কারের বাক্স খুলে পাওয়া যায় ৪২০ ভরি স্বর্ণ ও ১৮৮ ভরি রুপার অলঙ্কার। সে সময় বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ লাখ টাকা।
ছয় বছর পর সবশেষ বাক্স খুলে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৪৪ ভরি স্বর্ণ ও ১ হাজার ৮৮ ভরি রুপার অলঙ্কার। এ ছাড়া আনুমানিক ৬৪ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া গেছে।
ছয় বছর আগে পাওয়া অলঙ্কার বিক্রি করে ১ কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ১১০ টাকা আয় হয়েছিল। এবার অলঙ্কারের পরিমাণ বেশি হওয়া ও স্বর্ণের দাম বাড়ায় বিক্রির অর্থ ২০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে মসজিদ কমিটি।
বর্তমানে মসজিদের ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে ১৩১ কোটি ৮৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮১০ টাকা। অলঙ্কার বিক্রির অর্থ যোগ হলে মোট জমার পরিমাণ দেড়শ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।


