তাজমিন হত্যা: ‘প্রেমিক’ রাজু আটক

তাজমিন হত্যা: ‘প্রেমিক’ রাজু আটক
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতের পাশ থেকে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তার কথিত প্রেমিক কক্সবাজারের রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুকে আটক করেছে পুলিশ।

রোববার রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় পাঁচ মাস আগে পরিচয়ের সূত্র ধরে রাজুর সঙ্গে তাজমিনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে বাড়ি থেকে অভিমান করে বেরিয়ে কক্সবাজারে আসেন ওই কিশোরী। এখানে এক রাত অবস্থান করে বাড়ি ফেরার পথেই ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন তিনি।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী রাজুকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘তাজমিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তাকে আটক করা হয়েছে। রাজুই নিহত তাজমিনকে ফুসলিয়ে কক্সবাজারে নিয়ে এসেছিলেন। তাকে কুমিল্লার মামলায় আসামি দেখানো হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।’

তাজমিন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, কক্সবাজারে অবস্থান এবং বাড়ি ফেরার যাত্রাপথের নানা তথ্য সামনে এসেছে। রাজুর সঙ্গে তাজমিনের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বার্তা আদান-প্রদান এবং রিলস বিনিময়ের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। রাজুর পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও একটি সূত্রের দাবি, তাদের পরিচয় প্রায় পাঁচ মাসের।

রাজু প্রায় তিন বছর ধরে কক্সবাজার শহরের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করছেন। তাজমিনের সঙ্গে পরিচয়ের পর তাদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ে। গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর অভিমান করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তাজমিন। প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান তিনি। সেখান থেকে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠান। এরপর কক্সবাজারে আসেন ওই কিশোরী।

হোটেলের নথি ও সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত একটি তিনতলা আবাসিক হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষে রাজুর সঙ্গে ওঠেন তাজমিন। সেখানে তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেন। হোটেলের রেজিস্টারে তাজমিনের নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। রাজুর পরিচয় দেওয়া হয় বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে।

হোটেলের এক কর্মী জানান, রেজিস্টারে রাজুর দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর লেখা রয়েছে। এর মধ্যে একটি নম্বর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয়েছিল। পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছেড়ে যান।

হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্ক ব্যবস্থাপক মো. আবছার জানান, রাজুর জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হলেও তাজমিনের কোনো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়নি। ফলে অপ্রাপ্তবয়স্ক ওই কিশোরীর প্রকৃত পরিচয় ও বয়স যাচাই করা হয়নি।

আরও পড়ুন

রাজুর ভাষ্য, পরিবারের সদস্যদের ফোন আসতে থাকায় তাজমিনকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন তিনি। বাসভাড়ার টাকা না থাকায় ধার করে টিকিট কাটেন এবং ৫০০ টাকা দিয়ে তাঁকে বাসে তুলে দেন। অন্যদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাজমিনের জন্য প্রায় ৯০০ টাকা মূল্যের বাসের টিকিট কাটা হয়েছিল।

কক্সবাজারের ‘কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর’-এর কাউন্টার প্রতিনিধি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাত আটটার পর তাজমিন ও রাজু কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের জন্য ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’-এর টিকিট সংগ্রহ করেন। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেওয়া হয়।

তাজমিনের মরদেহের পাশে ‘আইকনিক এন্টারপ্রাইজ’-এর একটি বাসের টিকিট পাওয়া যায়। ওই টিকিটের সূত্র ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, কক্সবাজার শহরের কলাতলীর একটি কাউন্টার থেকে সেটি কেনা হয়েছিল। কাউন্টারটির পরিচালক আসহাব আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, মঙ্গলবার রাতে তার পরিচিত প্রায় ২০ বছর বয়সী এক তরুণ এক কিশোরীকে সঙ্গে নিয়ে টিকিট কাটতে এসেছিলেন। তরুণটি কিশোরীকে নিজের বান্ধবী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।

রাজুর দাবি, কুমিল্লায় ফিরে যাওয়ার পর তাজমিন তাকে ফোনে জানান, বাড়ির ফটক বন্ধ। পরে রেলস্টেশনে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানিয়ে ওই ব্যক্তির বাসায় থাকার সিদ্ধান্তের কথাও বলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় বলে দাবি করেন রাজু।

রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্যমতে, কুমিল্লায় পৌঁছে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর ফোনে কথা হচ্ছিল। অটোরিকশাচালকের বিষয়েও তাদের কথা হয়। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের মুঠোফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামেন তাজমিন। এরপর রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে মো. সুমন মিয়ার (৩৫) চালিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তিনি।

পুলিশের তথ্যমতে, সুমন তাজমিনকে তার গন্তব্যে না নিয়ে লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে তাকে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ৮ অক্টোবর সকালে জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন ধানখেতের আইল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেখানো স্থান থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এই ঘটনায় চালক সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। উদ্ধার করা মুঠোফোনের কলতালিকা ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ নিয়ে অধিকতর তদন্ত চলছে।’

তদন্ত শেষ হলে পুরো ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে তাজমিনের মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার বিকালে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। তখন তাজমিন নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না দিয়ে শুধু এক বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা বলেছিলেন। মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও তিনি কোথায় এবং কার কাছে আছেন, তা স্পষ্ট করে না বলায় তাকে উদ্ধার করতে পারেননি।

হত্যাকাণ্ডের খবর জানার পর রাজু নিজেকে নির্দোষ দাবি করে কান্নাকাটি করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে রোববার রাতে তাকে আটক করে পুলিশ। বর্তমানে তাজমিনের কক্সবাজারে আসা, রাজুর সঙ্গে তার সম্পর্ক, হোটেলে ভুয়া পরিচয়ে অবস্থান এবং বাড়ি ফেরার পথে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উদ্ধার করা মুঠোফোনের কলতালিকা ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad