মিসরে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম মাতসাদাশের ছয় সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। নিষিদ্ধঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য হওয়া এবং বিদেশি অর্থায়নে অনলাইনে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংবাদমাধ্যমটির সহপ্রতিষ্ঠাতা আবদেল রহমান মনসুর।
সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা ঘটনাটিকে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি দাবি করেছে।
মনসুরের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার রাতে আবদুল্লাহ কাদরির বাড়িতে গিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে কর্তৃপক্ষ। পরদিন মঙ্গলবার ভোরে নিজ বাড়ি থেকে মোহাম্মদ আবু এমাইরাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন পোর্ট সাইদ থেকে ওমর হেলাল, ঘারবিয়া প্রদেশ থেকে ইসলাম বারাকাত এবং কায়রো থেকে মোহাম্মদ মাহমুদ ও মোহাম্মদ আদেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের মুঠোফোন ও কম্পিউটার জব্দ করা হয়। আবু এমাইরার বাড়িতে অভিযানের সময় তার বইয়ের সংগ্রহ ও ইন্টারনেট রাউটারও নষ্ট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মনসুর।
মিসরের মানবাধিকার সংগঠন ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পারসোনাল রাইটস জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ছয় সাংবাদিকের কারও অবস্থান এখনো জানা যায়নি। তাদের পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবি, মিসরে এই প্রথম কোনো সংবাদমাধ্যমের পুরো সম্পাদকীয় দলকে গ্রেপ্তার করা হলো।
মনসুর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি এবং গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যরা তাদের অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
মিসরের বাইরে থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই দলের প্রত্যেকেই প্রতিদিন কাজে যাওয়ার সময় ঝুঁকির বিষয়টি জানতেন। কিন্তু মুক্ত সংবাদমাধ্যমকে ভয় পেয়ে সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনবে এবং তাদের জোরপূর্বক গুম করবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের পরিবার উদ্বিগ্ন, আমরাও উদ্বিগ্ন। আমরা শুধু চাই, তারা যেন অক্ষত অবস্থায় মুক্তি পান।’
২০১৮ সালে তথ্য যাচাইয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করে মাতসাদাশ। পরে মিসরসহ বিভিন্ন আরব দেশের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশে যুক্ত হয় সংবাদমাধ্যমটি। দেশটিতে স্বাধীন গণমাধ্যমের কার্যক্রম নানা বিধিনিষেধের মুখে থাকলেও মাতসাদাশের ফেসবুক পেজটির অনুসারী এক মিলিয়নের বেশি। তবে মিসরে সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইট বন্ধ রয়েছে।
মিসরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে মাতসাদাশকে বিদেশ থেকে পরিচালিত একটি অনিবন্ধিত অনলাইন পেজ হিসেবে বর্ণনা করে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, পলাতক মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্য হিসেবে চিহ্নিত মনসুরের নির্দেশনায় ছয় ব্যক্তি সংগঠনটির ‘মিডিয়া কমিটি’র সদস্য হিসেবে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ তৈরি করতেন। পরে সেসব সংবাদ প্রকাশ করা হতো। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র একজন সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগে মামলা করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করেনি কর্তৃপক্ষ।
মনসুর জানান, ২০২৩ সালে মাতসাদাশের দুই সম্পাদককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা তদন্তকারীরা মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাংবাদিকদের অধিকারবিষয়ক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) তথ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকদের কারাগারে রাখার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ মিসর। ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পারসোনাল রাইটসের হিসাবে, বর্তমানে দেশটিতে ২৬ জন সাংবাদিক কারাবন্দী রয়েছেন।
মাতসাদাশের সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসসহ ৮০টির বেশি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম যৌথ আবেদন জানিয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, মাতসাদাশ বছরের পর বছর প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালিয়ে মিসরের বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন প্রকাশের সুনাম অর্জন করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিকশিত হতে না দেওয়ার মধ্য দিয়ে মিসরীয় কর্তৃপক্ষের কথিত সংলাপ, স্বচ্ছতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের অঙ্গীকারের সঙ্গে অসংগতি দেখা যাচ্ছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০১৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সামরিক বাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করার পর মিসর মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে সাংবাদিক ও সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে সংগঠনটির সদস্য হওয়ার কিংবা মিথ্যা সংবাদ ছড়ানোর অভিযোগ আনার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
সূত্র: এপি


