ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে যাতায়াত করা মৈত্রী এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু-বেনাপোল রুট দিয়ে চালানো হলে সময় প্রায় তিন ঘণ্টা কমে ছয় ঘণ্টায় নেমে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
বর্তমানে ট্রেনটি যমুনা সেতু-দর্শনা রুট হয়ে চলাচল করে। প্রস্তাবিত নতুন রুট চালু করা হলে যাত্রার সময় কমার পাশাপাশি ভাড়াও কমতে পারে প্রায় ১ হাজার টাকা। এতে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগে আকাশপথের তুলনায় ট্রেন আরও সুবিধাজনক বিকল্প হয়ে উঠবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ।
ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ভ্রমণ করেছেন ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ।
গত ৯ সেপ্টেম্বর রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সংসদে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রেল মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউল হক সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তিন দিনের আন্তসরকার রেল বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধ থাকা আন্তসীমান্ত ট্রেন পরিষেবা চালুর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
দুই দেশই ট্রেন পরিষেবা পুনরায় চালুর সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে বেলে জানান কর্মকর্তারা।
২০০৮ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু করা হয়। ১৯৬৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া দুই দেশের যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এরপর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাতায়াতকারী যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মাধ্যম হয়ে ওঠে এই ট্রেন। বিশেষ করে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চিকিৎসার কাজে যাতায়াতকারীরা এটি ব্যবহার করতেন বেশি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত মৈত্রী এক্সপ্রেসে মোট ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬০ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছেন। বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী, এর প্রায় ৯৫ শতাংশ যাত্রী ছিলেন বাংলাদেশি।
ট্রেনটির গড় আসন ব্যবহারের হার ছিল ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। তবে ঈদ ও দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবের সময় এই হার ৯৫ শতাংশের বেশি ছিল। এতে বাংলাদেশি যাত্রীদের মধ্যে এই সেবার চাহিদার বিষয়টি উঠে আসে।
আন্তসীমান্ত যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার বর্তমান ব্যবস্থায় মৈত্রী এক্সপ্রেসের টিকিট বিক্রি থেকে পাওয়া আয়ের ৭৫ শতাংশ পায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। বাকি ২৫ শতাংশ পায় ভারতীয় রেলওয়ে।
বন্ধ হওয়ার আগে মৈত্রী এক্সপ্রেস টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু-ঈশ্বরদী-দর্শনা রুটে চলাচল করত। ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে এই রুটের দূরত্ব ছিল প্রায় ৩৯২ কিলোমিটার।
অনুমোদিত সময়সূচি অনুযায়ী, ট্রেনটি সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ঢাকা স্টেশন থেকে ছেড়ে বিকাল ৪টায় কলকাতায় পৌঁছানোর কথা ছিল। এতে সময় লাগত ৭ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। ফেরার পথে কলকাতার চিৎপুর টার্মিনাল স্টেশন থেকে সকাল ৭টা ১০ মিনিটে ছেড়ে বিকাল ৩টা ৩৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল। এ যাত্রায় সময় লাগত ৮ ঘণ্টা ২৫ মিনিট।
তবে বাস্তবে রেলপথের নানা কারণে যাত্রায় ৯ থেকে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত। বিশেষ করে ঢাকা-ঈশ্বরদী-দর্শনা অংশে এই সমস্যা বেশি ছিল।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতু রেলপথ চালুর পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও বেনাপোল সীমান্তমুখী ট্রেন চলাচলের জন্য নতুন একটি পথ তৈরি হয়েছে।
নতুন এই রুটে কমলাপুর থেকে বেনাপোল পর্যন্ত দূরত্ব ও যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগে এই পথে যেতে ৮ ঘণ্টার বেশি সময় লাগলেও এখন রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস প্রায় ৩ ঘণ্টা ৪ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছায়।
রেল কর্মকর্তারা মনে করছেন, যমুনা সেতু-দর্শনা রুটের পরিবর্তে পদ্মা সেতু ও বেনাপোল হয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু করা হলে একইভাবে সময় ও দূরত্ব কিছুটা কমে আসবে।


