গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের রায় প্রত্যাখান করে নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগের ঢাকা লকডাউন কর্মসূচির মধ্যে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে হাতবোমা বিস্ফোরণ, ঝটিকা মিছিল ও বাসে আগুনের ঘটনায় যেমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তেমনি পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে ঢাকার এক ওসির বক্তব্যও তুমুল আলোচনা তৈরি করেছে।
বাহিনীটির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, এসব বিস্ফোরণে জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ ও গোয়েন্দারা মাঠে নেমেছে। তবে এর মধ্যেই শনিবার সকালে বায়তুল মোকাররম ও গুলিস্তান এলাকায় ঝটিকা মিছিল হয়েছে।
শুক্রবার রাতে একাধিক হাত বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টা পরও কাউকে শনাক্ত বা আটক করা যায়নি। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের সদুত্তর নেই। এ অবস্থায় ঢাকায় নিরাপত্তার ব্যাপারে সবাই শঙ্কিত। প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের সক্ষমতা ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়েও।
ডিএমপির সদ্য সাবেক কমিশনার মো. সারওয়ার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো এবং তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর যে প্রয়োজন ছিল, গত দুই বছরে সেই কাজ কতটা হয়েছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’
তার মতে পুলিশকে আরও কার্যকর করতে জনবল ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ কতটা হয়েছে, সেটিও পর্যালোচনা করা দরকার।
পুলিশের মনোবল বাড়াতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে মত দিয়ে ঢাকার সাবেক পুলিশ প্রধান আরও বলেন, ‘ফলে পুলিশ তার রুটিন ডিউটি করতে পারছে না।’
পুলিশের ভেতরকার চিত্র ফুটে উঠেছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানার প্রত্যাহার করা ওসি মো. রাকিবুল হাসানের একটি বক্তব্যে। তার একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়েছে, যেখানে তিনি পুলিশের কোথায় কোথায় দুর্বলতা আছে সেটি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।
অডিওতে বলতে শোনা যায়, রবিউল বলেছেন, ‘জানি যে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসতেছে। কিচ্ছু হবে না আসলে, কিচ্ছু হবে না। আপনারা তো চিন্তা করতে পারছেন, রাস্তার পুলিশ কত দুর্বল। ভয়ানক দুর্বল। আসা উচিত। ডিসেম্বর দেরি হয়ে গেছে। এই মাসে আসা উচিত ছিল। চলে আসলি এই পুলিশ কিচ্ছু করতে পারবে না।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে রাজনীতিকীকরণের যে অভিযোগ বছরের পর বছর আলোচনায় ছিল, গণঅভ্যুত্থানের পরেও সেই চিত্র পাল্টায়নি বলেও উঠে এসেছে তার বক্তব্যে।
রবিউল বলেন, ‘সিনিয়র অফিসার সব বিএনপি করতেছে। আমরা তো বিএনপি করছি না। সব সিনিয়ররা বিএনপি করছে, আমরা বিএনপি করছি না। এই করার জন্য তো আমরা ডিপার্টমেন্টে আসি নাই। তোমরা খাবা-দাবা, … নিয়ে থাকবা আর আমরা এখানে বসে বসে কাজ করব, তা তো হবে না।’
মনির নামে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও বলা হয় ওই অডিওতে। রবিউল বলেন, ‘এগুলো সহ্য করা যায়? আর কী বলব? যারা পোস্টিং পাচ্ছে, তার (মনির) কাছে টাকা দিচ্ছে, সকালবেলা পোস্টিং হচ্ছে।’
ঢাকার ভাটারায় এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার একটা কাজ করে দিয়েছেন এবং সেই কর্মকর্তা এক কোটি টাকা নিয়েছেন বলেও আক্ষেপের কথা আছে রবিউলের সেই বক্তব্যে।
তিনি আরও বলেন, ‘এইভাবে চাকরি করা যাবে নাকি? অযোগ্য লোকগুলোরে কোন জায়গায় পদায়ন দেয় আর যোগ্য লোকগুলোকে চিপাচাপায় রাখছে।’ রবিউলের তোলা এসব অভিযোগ সত্য কি না, সেসব বিষয়ে সরকার খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেনি, কিন্তু তাকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. সারওয়ারও বাহিনীর সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন টাইমসকে। তিনি বলেন, ‘ডিএমপি গোয়েন্দা তথ্য থেকে কাজ করে। স্পেশাল ব্রাঞ্চ, সিটিএসবি ও এনএসআইসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ঢাকায় বোমা, আগুন ও মিছিলের ব্যাপারে আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকলে সেক্ষেত্রে পুলিশের ব্যথর্তা রয়েছে। আগাম তথ্য থাকলে পুলিশ প্রয়োজনীয় ফোর্স মোতায়েনসহ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করত।’
গুলশানে আওয়ামী লীগের একটি বড় মিছিল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের তৎপরতা বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল কি না, সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে, এমন কথাও বলেছেন তিনি।
ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী বলেন, ‘যেকোনো ধরনের অপ্রিতীকর ঘটনা ঠেকাতে ২০০ স্পটে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ এন এম মনিরুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘গুলশানে মিছিলের পর থেকেই তারা এ ধরনের কাজ করার চেষ্টা করছে। এজন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা আগামীতে ঘটতে না পারে, সে জন্য পুলিশের বিভিন্ন স্থানে যে উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে নজরদারি আরও বাড়াতে এবং শক্তিশালী করতে হবে।’
সরানো হয়েছে অনেককে
গত ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলকে কেন্দ্র করে পাঁচদিন পর গুলশান মডেল থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। একইদিন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় গুলশান বিভাগের উপকমিশনার-ডিসি এম তানভীর আহমেদকেও। একদিন পর সদর দপ্তরে বদলি করা হয় পুলিশের বিশেষ শাখা-এসবির প্রধান সরদার নুরুল আমিনকে।
নতুন এসবি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি মো. কামরুল আহসানকে। দায়িত্ব থেকে অন্যত্র সরানো হয়েছে সিটি এসবি প্রধানকেও।
গত ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহে ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে একটি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ২৭ কর্মকর্তা ও সদস্যকে বদলি করা হয়েছে।
নিষিদ্ধ সংগঠনের লকডাউনের ডাক
এর মধ্যে রোববার যুবলীগের ঢাকা লকডাউন কর্মসূচিতে একাত্মতা ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের ফাঁসির রায় ঘোষণা করে।
এরপর অনলাইনে রবিবার ঢাকা লকডাউনের কর্মসূচি ঘোষণা করে গণঅভ্যুত্থানের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগ।
পুলিশ ও গোয়েন্দারা মনে করছেন, কর্মসূচি সফল করার মতো সাংগঠনিক অবস্থায় নেই ক্ষমতাচ্যুত দলটি। তবে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে তারা নানা কিছু করছে।
মিছিল বেড়েছে ঢাকার বাইরেও
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, গত সেপ্টেম্বর ছাড়াও মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে ঝটিকা মিছিল হয়েছে। এর মধ্যে জুনে তাদের তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই মাসে সিলেট, রাজবাড়ী, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, ঝিনাইদহ, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, নেত্রকোনা, রাজশাহী, সাভার, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিল করা হয়।
জুনের মাঝামাঝি সিলেট নগরীর নবাব রোড এলাকায় পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করে। পরে অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করা হয়।
এর আগে ১২ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
একই মাসে যশোরে এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত তিনটি ঝটিকা মিছিল হয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরেও ১৭ মে আসাদগেট ও ২১ জুন কলেজগেট এলাকায় পৃথক মিছিলের ঘটনা ঘটে।
ঢাকা মহানগরীতে ১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের ১২২ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৩ জনকে গুলশান থানা এলাকা থেকে এবং ১৩ জনকে পল্লবী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গুলশানে আওয়ামী লীগের আলোচিত সেই মিছিলের পর শনিবার পর্যন্ত ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।


