দেশের ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ঘরের বাজারের লাখ লাখ গ্রাহকের তথ্য অনলাইনের গোপন একটি মাধ্যমে বিক্রির জন্য তোলা হয়েছে বলে দাবি উঠেছে। সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান সোকারাডারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘরের বাজারের ৪২ লাখের বেশি তথ্য নিজেদের কাছে থাকার দাবি করেছে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি।
এর মধ্যে ৬ লাখের বেশি গ্রাহকের তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য ঘরের বাজারের সার্ভার থেকে নেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্যদিকে ঘরের বাজার টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছে, তাদের গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষিত রয়েছে এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সোকারাডারের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোপন একটি অনলাইন ফোরামে ঘরের বাজারের ৪২ লাখের বেশি তথ্য বিক্রির দাবি করা হয়েছে।
এর মধ্যে ৬ লাখের বেশি গ্রাহকের তথ্য, ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি ঠিকানা, ৪ লাখ ৪৯ হাজারের বেশি ক্রয়াদেশ এবং প্রায় ২০ লাখ পণ্য সরবরাহসংক্রান্ত তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকসেবার কথোপকথনের তথ্যও থাকার দাবি করা হয়েছে।
তবে এগুলো তথ্য বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া ব্যক্তির দাবি। তথ্যগুলো আসল কি না কিংবা সরাসরি ঘরের বাজারের সার্ভার থেকে নেওয়া হয়েছে কি না, তার স্বাধীন যাচাই এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
বিষয়টি নিয়ে টাইমস ঘরের বাজারের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা জানিয়েছে, তাদের কাস্টমারদের তথ্য সুরক্ষিত আছে। গ্রাহকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই, তারা নিশ্চিন্ত ও আশ্বস্ত থাকতে পারেন। যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার উৎস শনাক্তে তারা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে।
তবে তাদের বক্তব্যে সার্ভারে অননুমোদিত প্রবেশের কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না, ছড়িয়ে পড়া তথ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে কি না কিংবা এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন প্রযুক্তিগত তদন্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তথ্য সত্যি হলে কী ধরনের বিপদ হতে পারে
কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, বাসার ঠিকানা ও কেনাকাটার তথ্য অপরাধীদের হাতে গেলে সেগুলো বিভিন্ন ধরনের প্রতারণায় ব্যবহার হতে পারে।
ধরা যাক, একজন প্রতারকের কাছে কারও নাম, ফোন নম্বর, বাসার ঠিকানা এবং আগে কেনা পণ্যের তথ্য রয়েছে। সে ফোন করে বলতে পারে, ‘আপনার আগের অর্ডারের টাকা ফেরত দেওয়া হবে’ অথবা ‘আপনার একটি পার্সেল আটকে আছে, কিছু টাকা পরিশোধ করতে হবে।’
আগের কেনাকাটার তথ্য জানা থাকায় কথাগুলো সত্যি মনে হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এরপর একটি ভুয়া লিংক পাঠিয়ে টাকা নেওয়া, গোপন নম্বর চাওয়া কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।
বাসার ঠিকানা ফাঁস হলেও ঝুঁকি আছে
অনেকের ধারণা, পাসওয়ার্ড বা ব্যাংকের তথ্য ফাঁস না হলে তেমন সমস্যা নেই। বাস্তবে নাম, মোবাইল নম্বর, বাসার ঠিকানা ও কেনাকাটার তথ্য একসঙ্গে পাওয়া গেলে একজন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণা করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
এর আগে বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানেও গ্রাহকের তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। হোটেল প্রতিষ্ঠান ম্যারিয়ট ও স্টারউডের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় কোটি কোটি গ্রাহকের নাম, ঠিকানা, ই-মেইল, ফোন নম্বর, জন্মতারিখ ও পাসপোর্টের তথ্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ম্যারিয়ট ও স্টারউডের একাধিক তথ্য ফাঁসের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে ৩৪ কোটির বেশি গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।
এ ধরনের তথ্য ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে ভুয়া বার্তা পাঠানো এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
বাংলাদেশেও ঘটেছে বড় ঘটনা
দেশেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরির অভিযোগের ঘটনা আগে ঘটেছে। ২০২৩ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কম্পিউটার ব্যবস্থায় সাইবার হামলার পর হামলাকারীরা ৫০ লাখ ডলার দাবি করেছিল। প্রায় ১০০ গিগাবাইট তথ্য প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। সেই তথ্যের মধ্যে যাত্রীদের পাসপোর্ট এবং ফ্লাইট, পণ্য পরিবহন ও কর্মীদের বিভিন্ন তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছিল।
এ ধরনের ঘটনা দেখায়, চুরি করা তথ্য শুধু বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা, পরিচয় নকল করা, ভুয়া ফোন বা বার্তা পাঠানো এবং আরও তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।
তাহলে ঘরের বাজারের ক্ষেত্রে আসলে কী হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। একদিকে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সোকারাডার বলছে, গোপন অনলাইন ফোরামে ঘরের বাজারের নামে ৪২ লাখের বেশি তথ্য বিক্রির দাবি পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ঘরের বাজার টাইমসকে জানিয়েছে, তাদের গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষিত রয়েছে এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
শুধু গোপন কোনো ফোরামে তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ঘরের বাজারের সার্ভার হ্যাক হয়েছে। পুরোনো তথ্য, বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা তথ্য অথবা ভুয়া তথ্যও কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে বিক্রির চেষ্টা করা হতে পারে। আবার সত্যিকারের তথ্য চুরির ঘটনাও প্রথমে এমন গোপন মাধ্যমেই সামনে আসতে পারে। তাই ৪২ লাখের বেশি তথ্য থাকার দাবিটি সত্য কি না, সেটি নিশ্চিত হতে প্রযুক্তিগত তদন্ত প্রয়োজন।
গ্রাহকদের কী করা উচিত
ঘরের বাজার বলছে, তাদের গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষিত রয়েছে। তারপরও গ্রাহকদের কিছুদিন অচেনা ফোন, খুদে বার্তা, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা ও ই-মেইলের বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকা ভালো।
বিশেষ করে ঘরের বাজার বা পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় দিয়ে কেউ গোপন নম্বর, পাসওয়ার্ড, ব্যাংক কার্ডের তথ্য বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গোপন নম্বর চাইলে দেওয়া উচিত নয়।
পণ্য ফেরত, টাকা ফেরত দেওয়া, ক্রয়াদেশ নিশ্চিত করা বা পণ্য পৌঁছে দেওয়ার খরচের নামে পাঠানো অপরিচিত কোনো লিংকেও প্রবেশ না করাই নিরাপদ।
ঘরের বাজারের গ্রাহকদের তথ্য আসলেই ফাঁস হয়েছে, না কি পুরো বিষয়টি ভিত্তিহীন, তার নিশ্চিত উত্তর পেতে এখন বিস্তারিত প্রযুক্তিগত তদন্তের ফলের অপেক্ষা করতে হবে।


