সংকট মেটাতে ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নজর

সংকট মেটাতে ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নজর
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির পাশাপাশি নতুন এক প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছাতে ‘স্মল মডুলার রিয়্যাক্টর’ বা এসএমআর নামের ছোট আকারের পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদার, এমনকি এক ভারতীয় বিজ্ঞানীর সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেছে সরকার।

প্রস্তাবিত এই ছোট রিয়্যাক্টরগুলো থেকে ১০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। যেসব দুর্গম অঞ্চল বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বা গ্রিড তৈরি করা বেশ কঠিন ও খরচসাপেক্ষ, সেসব জায়গার জন্যই মূলত এই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে।

মন্ত্রিসভার এক সদস্য জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি নিয়ে সরকার ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একজন ভারতীয় পারমাণবিক বিজ্ঞানীর সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা বলেছে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রযুক্তির ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুবিআনাম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, জাতীয় গ্রিডে পৌঁছানো কঠিন এমন এলাকাগুলোর জন্য এই ছোট রিয়্যাক্টরগুলো বেশ উপকারী হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘যেসব দুর্গম অঞ্চলে সঞ্চালন লাইন টানা বাস্তসম্মত নয়, সেখানে এই ইউনিটগুলো খুব কাজে দেবে। এ ছাড়া রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক হাবের মতো নির্দিষ্ট জায়গায় এগুলো সহজে ব্যবহার করা সম্ভব।’

আলোচনায় আমেরিকার প্রতিষ্ঠান

এই ছোট পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫ থেকে ৭টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেছে সরকার। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই এখনো চূড়ান্ত খরচের হিসেব বা আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয়নি। কারণ, তারা নিজেরাই এখনো প্রাথমিক নির্মাণ খরচ হিসেব করে দেখছে।

অন্যদিকে, চীন ১০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র তৈরির জন্য ৮০ কোটি ডলারের একটি প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী এই খরচকে অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেন। চীন ছাড়া অন্য কোনো দেশ এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক দর প্রস্তাব করেনি।

ছোট পারমাণবিক কেন্দ্রকে ভবিষ্যতের জন্য বেশ সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হলেও, বিশ্বজুড়ে এর বাণিজ্যিক ব্যবহার এখনো বেশ সীমিত।

আরও পড়ুন

বর্তমানে কেবল রাশিয়া ও চীনেই এ ধরনের কেন্দ্র বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও রোমানিয়ায় এ সংক্রান্ত প্রকল্পগুলো নির্মাণ বা সরকারি অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

চার থেকে পাঁচটি কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশে এমন চার থেকে পাঁচটি ছোট পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের কথা ভাবা হচ্ছে। তবে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবে রূপ নিতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যেতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ভাবনায় আপাতত ৪ থেকে ৫টি ইউনিটের কথা রয়েছে।’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বিদেশি সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে সামনে আরও কয়েক দফায় আলোচনা হবে।

গত ২৭ আগস্ট ওয়াশিংটনে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটের সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়, সেখানেও পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

রূপপুর প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা

পাবনার রূপপুরে রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা দুটি ইউনিটে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। এই কেন্দ্র পুরোপুরি চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ মেটাতে পারবে।

১১ বিলিয়ন (১১০০ কোটি) ডলারের এই বড় প্রজেক্টের ৯০ শতাংশ খরচই ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া।

প্রথম ইউনিটে ইতিমধ্যেই পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোড করা সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসেই এই ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে একটি ভালভে কারিগরি সমস্যা দেখা দেওয়া এবং কেন্দ্র এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের খবরের পর বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা পিছিয়ে গেছে।

জ্বালানি ভারসাম্য বজায় রাখার পরামর্শ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আগেই পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের চুক্তি ছিল। এখন তারা সেই সহযোগিতা আরও বাড়াতে চাইছে।

তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রচুর এলএনজি আমদানি করতে হয়। ছোট এই পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো চালু হলে নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে গ্যাস-কয়লার ওপর নির্ভরতা কমবে। তা ছাড়া, এই ধরণের কেন্দ্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নেই বললেই চলে।’

তবে পারমাণবিক বিদ্যুতের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভর না হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সব ধরনের জ্বালানির একটি সুষম মিশ্রণ বজায় রাখতে হবে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১০ শতাংশের বেশি পারমাণবিক উৎস থেকে আসা উচিত নয়।’

বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে গত আগস্টের শেষের দিকে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে ৪০টিরও বেশি কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ফলে ওই সময়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের সর্বোচ্চ চাহিদাই ঠিকমতো সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর