ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন নৌযানে ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে মঙ্গলবার এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এর পাল্টা জবাবে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর জর্ডানে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ১৮টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। আরও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে। এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
জর্ডানে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে দেশটির সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে একাধিকবার ইরানি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, গত দুই দিনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দুটি দফায় একটি মার্কিন নৌযানকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। মার্কিন নৌযানটি হামলা এড়িয়ে আঞ্চলিক জলসীমায় টহল অব্যাহত রাখে। এসব হামলায় কোনো মার্কিন সেনা আহত হননি।
এরপর মঙ্গলবার উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানো হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে, জাহাজগুলোর নাম কিভিক, চারমিনার, হরাইজন ১, রিয়েস্কো ও দেরিয়া। এর মধ্যে প্রথম চারটি ওমান উপসাগরে এবং দেরিয়া হরমুজ প্রণালির কাছে খার্গ দ্বীপের আশপাশে অবস্থান করছিল।
মার্কিন বাহিনী দাবি করেছে, হামলার আগে পাঁচটি জাহাজের নাবিকদের জাহাজ ছেড়ে যেতে বলা হয়েছিল।
এর আগে শনিবারও ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় ইরানের বিপ্লবী গার্ড একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ও একটি ডেস্ট্রয়ারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলার চেষ্টা করেছিল বলে দাবি করে ওয়াশিংটন। তখন যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করে বলেছিল, প্রয়োজন হলে ইরানের তেলবাহী জাহাজ বহরের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে প্রণালিতে অস্থিরতা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪৬ ডলারে উঠে যায়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্যও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানের হামলার জবাব না দিয়ে বসে থাকবে না যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, ইরান যখনই মার্কিন নৌযানে হামলা চালাবে বা হামলার চেষ্টা করবে, তখন তাদের তেলবাহী জাহাজ হারাতে হবে।
তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, হরমুজ প্রণালির সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। সামরিক উপায়ে সংকট মোকাবিলার প্রতিটি প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে এমন এক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ও অর্থনীতি ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালির কাছে একটি নতুন ‘বহিষ্কার অঞ্চল’ ঘোষণা করতে পারে। ওই এলাকায় প্রবেশ করতে চাওয়া জাহাজগুলোকে ইরানের নির্ধারিত পথ অনুসরণ করতে হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনী মঙ্গলবার কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরের কাছে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলোর নাবিকদের দ্রুত জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার সতর্কতা দিয়েছে। এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে এবং ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় সহযোগিতা করছে—এমন অভিযোগ করেছে তেহরান।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলীয় অংশ দিয়ে সীমিতসংখ্যক জাহাজ চলাচলে সহায়তা করছে। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচিত এই প্রণালির কোন পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল করবে, তা নিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে।


