মার্কিন সেনাদের অবস্থান ফাঁস এড়াতে ফোন-কম্পিউটারে ট্র্যাকার বন্ধ

মার্কিন সেনাদের অবস্থান ফাঁস এড়াতে ফোন-কম্পিউটারে ট্র্যাকার বন্ধ
ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

কোনো বাণিজ্যিক তথ্যের মাধ্যমে সেনাদের অবস্থান যাতে শত্রুদের হাতে না পৌঁছায়, সে ঝুঁকি কমাতে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ফোন ও কম্পিউটারে বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং (অ্যাড ট্র্যাকার) ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

শুক্রবার পেন্টাগনের প্রকাশিত কয়েকটি চিঠি এবং বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে এ তথ্য জানা গেছে।সাম্প্রতিক সময়ে কিছু খবরে দাবি করা হয়েছিল, অ্যাড ট্র্যাকারের মতো মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন কিংবা সফটওয়্যারে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে ডিভাইসের অবস্থান শনাক্তকরার অনুমতি দিতে হয়। বাণিজ্যিকভাবে কেনাবেচা হওয়া অবস্থান-সংক্রান্ত সেসব তথ্য ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্ত ও তাদের লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব হতে পারে।

ওরেগনের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেন কয়েক মাস ধরে এ বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে জবাব চাইছিলেন। তার কাছে পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী প্রায় দুই মাস আগে তাদের কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনে থাকা অ্যাড ট্র্যাকারের ব্যবহার বন্ধ করেছে। মার্কিন বিশেষ অভিযান কমান্ডও জানিয়েছে, তারা সম্প্রতি উইন্ডোজচালিত ডিভাইসগুলোতে (কম্পিউটার, ল্যাপটপ) এই ব্যবস্থা বন্ধ করেছে।

পেন্টাগন রয়টার্সকে জানিয়েছে, মোবাইল ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞাপন শনাক্তকারী বা অ্যাড ট্র্যাকার চলতি বছরের শুরুর দিক থেকেই বন্ধ রাখা হয়েছে। উইন্ডোজ কম্পিউটারে এই ট্র্যাকার ২০২১ সালের আগেই বন্ধ করা হয়েছিল। তবে অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপলের মোবাইল ডিভাইসে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে।

রন ওয়াইডেনের কাছে পাঠানো সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর আলাদা চিঠিতেও সামরিক ডিভাইসে অ্যাড ট্র্যাকার বন্ধ করার কথা জানানো হয়েছে। তবে নৌবাহিনী ঠিক কখন এ ব্যবস্থা নিয়েছে, তা তাদের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। বিমানবাহিনী ও বিশেষ অভিযান কমান্ডও অতিরিক্ত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ হলো- মোবাইল অ্যাড আইডি (মেইড)। এটি একটি ডিভাইসের সঙ্গে যুক্ত ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (একক পরিচয় নম্বর) যা বিভিন্ন অ্যাপে ব্যবহারকারীর কার্যকলাপ অনুসরণ করতে এবং তার অবস্থান নির্ণয় করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

এসব অ্যাপে বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে অনেক ব্যবহারকারী অ্যাড ট্র্যাকারের সহায়তা নেন। সেক্ষেত্রে মেইড ডিভাইসের সংবেদনশীল তথ্যে দখল নিতে পারে যা তথ্য-দালালদের কাছে বিক্রির শঙ্কা থেকে যায়। তথ্য-দালালরা বিভিন্ন উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে, সেগুলো একত্র করে এবং অন্য প্রতিষ্ঠান বা ক্রেতার কাছে বিক্রি করে। ফলে একজন সেনা কোথায় অবস্থান করছেন, কোন এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করছেন বা কোন ডিভাইস ব্যবহার করছেন- এ ধরনের তথ্য সরাসরি সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার বাইরে থেকেও সংগ্রহ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন

জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এখানেই বড় ঝুঁকি দেখছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। কারণ কোনো শত্রুপক্ষ যদি এসব তথ্য কিনে নিতে পারে, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা মার্কিন সেনা, সামরিক স্থাপনা বা ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব।

রন ওয়াইডেন এবং নর্থ ক্যারোলিনার রিপাবলিকান প্রতিনিধি প্যাট হ্যারিগান শুক্রবার পেন্টাগনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সামরিক বাহিনী বাণিজ্যিকভাবে কেনাবেচা হওয়া অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্যের ঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলেছেন তারা।

রন ওয়াইডেনের মতে, সামরিক বাহিনী অ্যাড ট্র্যাকার বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিলেও হুমকি পুরোপুরি দূর হয়েছে- এমনটা বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেছেন, সামরিক বাহিনীর নেওয়া পদক্ষেপগুলো যে এই ঝুঁকি পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি, তা স্পষ্ট।

প্যাট হ্যারিগান আরও সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুরা যেন শুধু টাকা খরচ করে এমন তথ্য কিনতে না পারে, যা তাদের মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করতে সাহায্য করবে।

পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা আইনপ্রণেতাদের সরাসরি এ বিষয়ে জবাব দেবে।

গোপনীয়তা ও বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ডিক্রিপ্টঅ্যাডসের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক এডওয়ার্ডস মনে করেন, সামরিক বাহিনীর ডিভাইসে অ্যাড ট্র্যাকার বন্ধ করা অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তার মতে, এর ফলে সামরিক সদস্যদের অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য বিপুল পরিমাণে সংগ্রহ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করার সুযোগ কমবে।

তবে শুধু এই অ্যাপ্লিকেশন বন্ধ করলেই সেনাদের অবস্থান গোপন রাখা নিশ্চিত হবে না। তিনি সতর্ক করেন, বিভিন্ন অ্যাপ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও জটিল উপায়ে একজন সামরিক সদস্যকে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি ডিভাইসের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নেটওয়ার্কের তথ্য এবং অবস্থান-সংক্রান্ত অন্য তথ্য মিলিয়ে ব্যবহারকারীর অবস্থান বের করা যেতে পারে।

কাজেই স্মার্টফোন থেকে তৈরি হওয়া অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্যের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি সামরিক বাহিনী মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টিও বিবেচনা করছে।

জুলাই মাসে রয়টার্স জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা কিছু মার্কিন সেনাকে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ করে জমা দিতে বলা হতে পারে। কারণ, সেনাদের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও ইন্টারনেটে প্রকাশের ফলে ওই ভিডিও থেকে মার্কিন ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পেতে পারে ইরান। এমন তথ্য ব্যবহার করে ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার আশঙ্কা রয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর