যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শূকর থেকে প্রতিস্থাপন করা একটি কিডনি একজন মানুষের শরীরে ২৭১ দিন সফলভাবে কাজ করেছে। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর থাকা শূকরের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ঘটনা।
বিবিসির খবরে বলা হয়, টিম অ্যান্ড্রুজ নামের ওই রোগী বলেছেন, এই প্রতিস্থাপন তাকে নতুন করে বেঁচে থাকার ‘আশা’ দিয়েছে। এমনকি গত ২৭১ দিন তাকে হাসপাতালে গিয়ে রক্ত পরিশোধনের (ডায়ালাইসিস) জন্য কৃত্রিম কিডনি যন্ত্রের ওপরও নির্ভর করতে হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল ব্রিগহ্যাম হাসপাতালের চিকিৎসক দলের মতে, তাদের এই গবেষণা প্রমাণ করছে- অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে ‘ব্রেইন ডেড’ মানুষের অঙ্গ পাওয়ার আগ পর্যন্ত শূকরের অঙ্গ একটি ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এই প্রতিস্থাপিত অঙ্গেরও মেয়াদকাল আছে। এমনকি অ্যান্ড্রুজের দেহে প্রতিস্থাপিত শূকরের কিডনিটিও শেষ পর্যন্ত বিকল হয়ে যায় এবং তা অপসারণ করতে হয়। এরপর কিছুদিন তাকে আবার রক্ত পরিশোধন চিকিৎসা নিতে হয়। পরে একজন দাতার কাছ থেকে পাওয়া কিডনি তার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়।
অন্য প্রজাতির প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপনের এই পদ্ধতিকে বলা হয় আন্তঃপ্রজাতি অঙ্গ প্রতিস্থাপন। বিশ্বজুড়ে মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্গের ঘাটতি থাকায় চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীরা এই পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় এক লাখ মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু প্রতি বছর কেবল ২৫ হাজারের মতো কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়। যুক্তরাজ্যেও সাত হাজারের বেশি মানুষ কিডনি প্রতিস্থাপনের তালিকায় রয়েছেন।
অ্যান্ড্রুজকে বলা হয়েছিল, কিডনি প্রতিস্থাপনের তালিকায় নাম লেখানোর পর তার সুযোগ পেতে সাত বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কিন্তু গড়ে একজন মানুষ কৃত্রিম কিডনি যন্ত্রের মাধ্যমে রক্ত পরিশোধন চিকিৎসায় পাঁচ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারেন। অর্থাৎ, অ্যান্ড্রুজের ক্ষেত্রে ‘মানুষ দাতার’ কিডনি প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ ছিল।
তিনি বলেন, ‘আমার হাতে সময় খুব কম ছিল। পরিস্থিতি খুব হতাশাজনক হয়ে উঠেছিল।’
এমন পরিস্থিতিতে একটি গবেষণা প্রকল্পে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের ধারণাকে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ‘প্রটোটাইপ’ (গবেষণা পাত্র) হয়ে ওঠার সুযোগ পাওয়াকে তিনি ‘বেঁচে থাকার আশা’ এবং ‘অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তের আলো’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘আশাই সবচেয়ে বড় বিষয়। এই কৃত্রিম কিডনি যন্ত্র থেকে মুক্ত হওয়ার এবং নিজের জীবন নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ পাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
চিকিৎসকরা জানান, অ্যান্ড্রুজের কিডনি বিকল হওয়ার কারণ ছিল টাইপ-২ ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা। তার কিডনি ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছিল।
২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন তার শরীরে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়, তখন তার বয়স ছিল ৬৬ বছর।
চিকিৎসকদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিস্থাপনের পরপরই কিডনিটি কাজ শুরু করে। কিডনিটি ২৭১ দিন পর্যন্ত কার্যকর ছিল এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তা অপসারণ করা হয়।
এরপর টিম অ্যান্ড্রুজ আরও ৮২ দিন কৃত্রিম কিডনি যন্ত্রের মাধ্যমে রক্ত পরিশোধন চিকিৎসা নেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি একজন মানব দাতার কাছ থেকে নতুন কিডনি পান। বর্তমানে সেই কিডনি ভালোভাবে কাজ করছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, আন্তঃপ্রজাতি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য শূকর সবচেয়ে উপযুক্ত প্রাণী। কারণ তাদের অঙ্গের আকার মানুষের অঙ্গের প্রায় কাছাকাছি এবং দীর্ঘদিন ধরে তাদের পালন ও প্রজননের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তবে খামার থেকে সরাসরি একটি শূকরের কিডনি নিয়ে মানুষের শরীরে বসিয়ে দিলেই তা কাজ করবে না। এমন ঘটলে মানুষের শরীর সঙ্গে সঙ্গে ওই অঙ্গকে ‘বাইরের বস্তু’ হিসেবে শনাক্ত করবে এবং ভয়াবহ রোগ প্রতিরোধী আক্রমণ শুরু করবে। এর ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কিডনিটি ‘কালো’ হয়ে যেতে পারে, কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং অঙ্গের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় গবেষকেরা বিশেষভাবে তৈরি ইউকাটান বা ক্ষুদ্রাকৃতির শূকর ব্যবহার করেছেন। এসব শূকরের দেহে বাইরে থেকে জিনগত গঠনে ৬৯টি পরিবর্তন আনা হয়েছে, যাতে তাদের অঙ্গ মানুষের শরীরের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
এই পরিবর্তনের মাধ্যমে শূকরের কোষের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যেগুলো মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সহজে শনাক্ত করে আক্রমণ করে। পাশাপাশি কিছু মানব জিন যুক্ত করা হয়েছে, যা শূকরের টিস্যুকে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছ থেকে আড়াল করতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া শূকরের জিনের ভেতরে থাকা সুপ্ত ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থাও করা হয়েছে, যাতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
ম্যাসাচুসেটস জেনারেল ব্রিগহ্যামের অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিজ্ঞান কেন্দ্রের চিকিৎসক লিওনার্দো রিয়েলা বলেন, অঙ্গের ঘাটতির কারণে বিশ্বজুড়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন রোগীদের জন্য আশা তৈরি করতে কঠোর পরিশ্রম করছি, যাদের কাছে জীবিত কোনো দাতা নেই। আমরা বিশ্বাস করি, আন্তঃপ্রজাতি অঙ্গ প্রতিস্থাপন এমন একটি বিকল্প হতে পারে, যার মাধ্যমে রোগীদের কৃত্রিম কিডনি যন্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি প্রতিস্থাপনের সুযোগ দেওয়া সম্ভব।’
চিকিৎসকেরা জানান, অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপিত শূকরের কিডনিতে শুরুতে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার আক্রমণের কিছু লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। তবে ওষুধের মাত্রা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
কিন্তু প্রায় ছয় মাস স্বাভাবিক থাকার পর পর প্রতিস্থাপিত কিডনির রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। পরে অঙ্গে প্রদাহ দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে কিডনিটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
কেন এমনটি ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। কারণ চিকিৎসকেরা এমন কোনো লক্ষণ পাননি, যেখানে দেখা যায় মানুষের শরীরের তৈরি অ্যান্টিবডি সরাসরি শূকরের কিডনিকে আক্রমণ করেছে।
চিকিৎসকেরা তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে লিখেছেন, এই ঘটনা মানুষের কিডনি প্রতিস্থাপনে শূকরের অঙ্গ ব্যবহারের সম্ভাবনা যেমন তুলে ধরেছে, তেমনি এই প্রযুক্তির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলোকেও স্পষ্ট করেছে।


