আশ্রয়ের ঘরেই আতঙ্ক, সংস্কারের অপেক্ষায় আড়াই দশক

আশ্রয়ের ঘরেই আতঙ্ক, সংস্কারের অপেক্ষায় আড়াই দশক
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাইরে বৃষ্টি নামলেই দিয়াবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের বুক কেঁপে ওঠে। কারণ, বৃষ্টি শুধু বাইরে নয়, নামে তাদের ঘরের ভেতরেও। টিনের চালের অসংখ্য ফুটো দিয়ে টুপটাপ পানি পড়ে মেঝেতে। কোথাও ভাঙা খুঁটি থেকে বেরিয়ে এসেছে রড, কোথাও নড়বড়ে বেড়া। পানি ঠেকাতে টানানো হয়েছে পলিথিন। তাতেও শেষরক্ষা না হলে রাত জেগে বালতি-জগ হাতে পানি সরাতে হয়।

নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য যে ঘরগুলো তৈরি হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেই ঘরই এখন তাদের কাছে হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের ঠিকানা।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চালা ইউনিয়নের দিয়াবাড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পে এমন দুর্ভোগে দিন কাটছে ১০০ পরিবারের। প্রায় ২৫ বছর আগে ভূমিহীন, বিধবা ও অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে নির্মিত হয়েছিল এসব ঘর। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বড় ধরনের সংস্কারের দেখা মেলেনি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একসময়কার নিরাপদ ঘরগুলো এখন জরাজীর্ণ। ভাঙা বেড়া, নড়বড়ে খুঁটি, ক্ষয়ে যাওয়া টিন, নষ্ট দরজা-জানালা এবং ব্যবহারের অনুপযোগী টয়লেট-গোসলখানা নিয়ে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন বাসিন্দারা।

প্রকল্পের অধিকাংশ ঘরের খুঁটির অবস্থা এতটাই নাজুক যে, কোথাও কোথাও খুঁটি ভেঙে রড বেরিয়ে এসেছে। টিনের চাল ক্ষয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ছিদ্র। সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের মেঝেতে পানি জমে যায়। ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র, বিছানা কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাঁচাতে বাসিন্দাদের ছুটতে হয় এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বৃষ্টি থামলেও তাদের দুর্ভোগ থামে না; ভেজা মেঝে আর স্যাঁতসেঁতে ঘর নিয়েই কাটে রাত।

এই কষ্টের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। সংসারের খাবার জোগাড় করতেই যেখানে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয়, সেখানে ঘর মেরামতের জন্য আলাদা টাকা জোগাড় করা তাদের কাছে প্রায় অসম্ভব। ফলে ভাঙাচোরা ঘরই হয়ে উঠেছে তাদের স্থায়ী ঠিকানা।

এই প্রকল্পেই বসবাস করেন আয়েশা বেগম। ১১ বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যায়। এখন ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। সংসারে রয়েছে নাবালক ছেলে। শারীরিক অসুস্থতা আর অভাবকে সঙ্গী করেই ঘরের বারান্দায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা খরচ করে ছোট একটি দোকান বসিয়েছেন। সেই দোকানের সামান্য আয় দিয়েই চলে তার সংসার।

আয়েশা বেগম বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই আমার কষ্ট শুরু। কয়েক মাস পর আমি স্ট্রোক করি। এখন ঠিকমতো হাঁটতেও পারি না। তাই ৫০০/১০০০ টাকা দিয়ে ঘরের বারান্দায় ছোট একটা দোকান দিয়েছি। দোকান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চালাই। একবেলা খাবার জুটলে অন্যবেলা খেতে কষ্ট হয়ে যায়।”

আরও পড়ুন

নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়েশা বলেন, “বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। পলিথিন টানিয়েও পানি আটকানো যায় না। ঘরের খুঁটি ভেঙে রড বের হয়ে গেছে। এই ঘরে থাকতে ভয় লাগে।”

আয়েশার ঘরের গল্পটি তার একার নয়। প্রকল্পের প্রায় প্রতিটি ঘরেই যেন একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। কারও ঘরের চাল ফুটো, কারও বেড়া ভাঙা, কারও দরজা-জানালা নষ্ট। দীর্ঘদিন ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোথাও টয়লেট-গোসলখানা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মৌলিক সুবিধার ঘাটতিও তাদের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

রাফিজা বেগমের স্বামী মারা গেছেন ১৩ বছর আগে। ছেলে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খান। ফলে মায়ের ঘর মেরামতের সামর্থ্য তারও নেই। রাফিজা বেগম বলেন, “আমার স্বামী মারা গেছে ১৩ বছর আগে। ছেলে নিজের সংসার চালাতে পারে না। আমাদের ঘরের অবস্থা খুব খারাপ। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে। পলিথিন টানিয়েও পানি আটকানো যায় না। ঘরের খুঁটি ভেঙে রড বের হয়ে গেছে। কখন কী হয়, সেই ভয় থাকে।”

মনোয়ারা বেগমের কণ্ঠেও জমে আছে দীর্ঘদিনের হতাশা। ঘরের পাশাপাশি প্রকল্পের টয়লেট ও টিউবওয়েলের দুরবস্থার কথাও জানান তিনি। তার ভাষায়, “ঘরের অবস্থা তো যা তা। টয়লেট নষ্ট, টিউবওয়েল নষ্ট। এত বছর ধরে কষ্ট করছি। আমরা গরিব মানুষ। নিজেদের টাকা দিয়ে ঘর ঠিক করার সামর্থ্য নেই। সরকার যদি একটু নজর দিত, তাহলে আমাদের কষ্টটা কমত।”

কাজল বেগমের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার স্বামী। সেই সামান্য আয়েই চলে সংসারের খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন। ঘর মেরামতের কথা ভাবার সুযোগ নেই তাদের। কাজল বেগম বলেন, “আমার স্বামী একাই আয় করে। সেই টাকা দিয়ে সংসারের সব খরচ চালাতে হয়। এই টাকা দিয়ে সংসার চালাব, নাকি ঘর মেরামত করব? বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। তখন মনে হয়, আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই।”

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই প্রকল্পে বসবাস করছেন রেখা আক্তার। স্বামী ও দুই ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। আশ্রয়ণ প্রকল্পে এসে নিরাপদ জীবনের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্নের জায়গা নিয়েছে দুশ্চিন্তা। রেখা আক্তার বলেন, “দুই যুগ ধরে এখানে আছি। স্বামী আর দুই ছেলে নিয়ে সংসার। এত বছর হয়ে গেল, ঘরের অবস্থা ভালো হয়নি। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। তখন থাকা যায় না। আমরা চাই, সরকার আমাদের ঘরগুলো একটু ঠিক করে দিক।”

প্রকল্পের বাসিন্দা গোলাম  মোস্তফা মিয়ার দাবি, ১০০টি ঘরের কমবেশি একই অবস্থা। তিনি বলেন, “আমাদের ১০০ ঘরের অবস্থাই এখন বেহাল। টিনের চালে একাধিক জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। আমাদের আয়-রোজগার ভালো থাকলে কারও কাছে সাহায্য চাইতাম না। সরকার যদি দ্রুত ঘরগুলো মেরামত করে দিত, তাহলে আমাদের অনেক উপকার হতো।”

বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘরগুলোর দুরবস্থার কথা তারা একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছেন। বিভিন্ন সময় সংস্কারের আশ্বাসও পেয়েছেন। কিন্তু সেই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি। ফলে বছর পেরিয়ে বছর, বর্ষা পেরিয়ে বর্ষা—একই ভাঙাচোরা ঘরেই জীবন কাটছে তাদের।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, “পুরো প্রকল্প সংস্কারের বিষয়টি সরকারের নীতিমালার আওতাভুক্ত। সরকার নতুন করে প্রকল্প সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিলে জেলা প্রশাসন তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি কোনো বাসিন্দা ব্যক্তিগতভাবে ঘর সংস্কারের জন্য আবেদন করলে প্রশাসন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করে সাধ্যমতো সহযোগিতার চেষ্টা করবে।”

দিয়াবাড়ির বাসিন্দাদের কাছে এখন বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক, রাত মানেই দুশ্চিন্তা আর ঘর মানেই নিরাপত্তাহীনতা। ২৫ বছর ধরে অপেক্ষা করতে করতে তাদের অনেকের বয়স বেড়েছে, সন্তান বড় হয়েছে, সংসার বদলেছে; বদলায়নি শুধু ভাঙাচোরা ঘরের চেহারা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর