জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ভাড়াটে খুনি দিয়ে সিলেটে বাসার ভেতরে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা।
শুক্রবার রাতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানায় বাবা আব্দুস সাত্তার, মা সুরাইয়া ও গৃহকর্মীকে খুনের মামলার এজহার জমা দিতে গিয়ে এ দাবি করেন তিনি।
এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, একটি জমির মালিকানা নিয়ে চলমান মামলার জের ধরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে তার বাবা, মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। তবে হত্যার ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়া নামে যে ব্যক্তিকে আটক করেছে, এজাহারে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মো. মঈনুল জাকির এজাহার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে।’
এজাহারে সেলিনা উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তার বাবা সিলেটে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি ইজারা নেন। সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে তারা বসবাস করছিলেন। ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ওই জমিসহ সমিতির ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্সের নামে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিল করেন। পরে নামজারি করে জমিটির মালিকানা দাবি করেন তিনি।
এ নিয়ে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন আব্দুস সাত্তার। মামলাটি বর্তমানে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন। এরপর থেকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সেলিনা।
তিনি আরও জানান, ২০২৩ সালে সিরাজুল ইসলাম তার বাবা এম এ সাত্তার, মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির বর্তমান চেয়ারম্যান জমিংথাংগা লুসাইসহ কয়েকজন ইজারাগ্রহীতার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। সেটি অতিরিক্ত জেলা জজ ৫ম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এর জেরে ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম আমিন হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে আব্দুস সাত্তারের বাসায় যান। সেখানে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে হুমকি দেওয়া হয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে ঘটনাটি নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। পরে প্রতিকার না পেয়ে ওই বছরের ৬ আগস্ট তৌহিদুল আদালতে মামলা করেন। মামলাটি ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেলিনার অভিযোগ, গত ২৮ জুলাই মুখ্য জেলা জজ ২য় আদালতে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি-সংক্রান্ত স্বত্ব ৭৩/২৩ মামলার শুনানির সময় তার বাবার নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর ৩০ জুলাই তার বাবা আদালতে গেলে তাকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়া হয়।
সেলিনার দাবি, স্বত্ব মামলা থেকে সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি নিয়োগ করা হয়। এরপর সুপরিকল্পিতভাবে গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় ঢুকে তার আব্দুস সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়। একই সময় বাসা থেকে বিভিন্ন কাগজপত্র, সাধারণ ডায়েরির কপি ও দলিল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এজাহারে বাবুল মিয়ার নাম না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি খান মো. মঈনুল জাকির বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। সুতরাং অভিযোগে বাবুলের নাম না থাকা এবং হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার বিষয়টি, দুটিই আমরা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করব।’
গত বুধবার সকালে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহকর্মী তাহমিনার (১৫) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিন বিকালে সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়াকে (৪০) আটক করা হয়। তিনি রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির মৃত নূর মিয়ার ছেলে। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।


