আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, মাতৃভাষায় শিক্ষা সম্প্রসারণ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং শিক্ষা ও চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের দাবিতে আট দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব সুপারিশ করেন বক্তারা।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকাস্থ সিরডাপের এটিএম শামসুল হক মিলনায়তনে ‘আদিবাসী জনগণ: জীবন, ভূমি অধিকার ও সংস্কৃতির সম্মান’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, আদিবাসীদের জীবন, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে ভূমির সম্পর্ক গভীর। তাই ঐতিহ্যগত ও প্রথাগত ভূমি অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য অ্যাডভোকেট মাধবী মারমা পার্বত্য অঞ্চলের প্রথাগত নেতৃত্ব ব্যবস্থা নিয়ে বলেন, কারবারি, হেডম্যান ও রাজা প্রথা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের অংশ। এই প্রথা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি প্রথাগত নেতাদের আরও শিক্ষিত ও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ভূমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে হেডম্যানদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পার্বত্য এলাকায় জমি বিক্রি বা প্রথাগত মালিকানা হস্তান্তরে হেডম্যানের সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ। একই জমি নিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে রিপোর্ট দেওয়ার মতো ঘটনা বিরোধ সৃষ্টি করে।
জুম চাষ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি পাহাড়িদের ঐতিহ্যগত কৃষি পদ্ধতি। শুধু জুম চাষের কারণে বন উজাড় হয়—এমন ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। জুম চাষকে আধুনিকায়ন এবং জুমনির্ভর জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে মাধবী মারমা বলেন, নিজের ভাষায় শিক্ষা শিশুর শেখার ভিত্তি তৈরি করে। মাতৃভাষা হারিয়ে গেলে সংস্কৃতির একটি বড় অংশও হারিয়ে যায়। তাই পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে মাতৃভাষার চর্চা বাড়াতে হবে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ বলেন, অধিকার আদায়ে নিজেদের ঐক্য আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, বঞ্চনার বিষয়গুলো তুলে ধরার পাশাপাশি রাষ্ট্রের ইতিবাচক উদ্যোগ কাজে লাগাতে হবে। অধিকার, শিক্ষা, ভূমি ও উন্নয়নের মতো মৌলিক ইস্যুতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সেমিনারে মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে বলা হয়, ভূমি ও সংস্কৃতি আদিবাসীদের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকার হারানো, ভাষা ও সংস্কৃতির সংকট এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিছু অগ্রগতি হলেও ভূমি সমস্যা, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির ঘাটতি এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
সেমিনারে আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় আট দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—জাতীয়ভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন, সংবিধানের ২৩(ক) ধারায় ব্যবহৃত ‘উপজাতি’ ও ‘নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দের পরিবর্তে গ্রহণযোগ্য পরিভাষা ব্যবহার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন, অধিকার সুরক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে পৃথক সেল গঠন, আদিবাসী এলাকায় পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন, স্বাস্থ্যসেবায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল করা।
সেমিনারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক (অনারারি) সারা হোসেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, গবেষক ঈশিতা দস্তিদার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ফওজিয়া মোসলেমসহ মানবাধিকারকর্মী, গবেষক ও আদিবাসী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


