আন্দোলন ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে, শেষ পর্যন্ত রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতন। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরিস্থিতি কেন সংঘাতময় হয়ে উঠল, এই প্রশ্নে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা আওয়ামী লীগ শাসনামলে সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারা, নির্বাচন ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপ্রয়োগসহ নানা কারণের কথা তুলে ধরছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের দপ্তর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে যে প্রতিবেদনে দিয়েছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ ছাড়াও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গণতান্ত্রিক পরিসরের সংকোচন, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের কথা উল্লেখ করা হয়।
সংস্থাটি বলছে গণঅভ্যুত্থানে অধিকাংশ বেসামরিক মানুষ হতাহত নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতেই হন। কিছু ক্ষেত্রে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের খুব কাছ থেকে গুলির ঘটনা ছিল।
ক্ষোভের শেকড় আরও গভীরে ছিল বলে মনে করেন ৩ আগস্টের দ্রোহযাত্রায় সরকার পতনের এক দফার কথা বলা বর্তমানে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘তরুণদের মধ্যে কর্মসংস্থানের সংকট, মূল্যস্ফীতি, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, নিয়োগে দুর্নীতি এবং মানুষের ভরসার প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংস এসব দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতের নানা ঘটনার পাশাপাশি ৫ আগস্টের আর প্রধান অনুঘটক হিসেবে উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে হামলা এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরস্ত্র শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে কাছ থেকে গুলি করার ভিডিও।
এই ঘটনার পরেই মূলত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পরিস্থিতি। পরে সেনাবাহিনী নামিয়ে এবং কারফিউ আরোপ করেও পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। ছাত্র-জনতার ঢাকামুখী মার্চের মধ্যে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে উড়ে যান। অবসান ঘটে তার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে।
ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন টাইমসকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের বৈষম্য, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহির অভাবের বিরুদ্ধে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।’
নির্বিচারে গুলি
শিক্ষার্থীদের বড়সড় আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোটা বাতিল হলেও ২০২৪ সালের জুনে সেই আদেশ অবৈধ ঘোষণা করে হাই কোর্ট। ফের রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা।
একের পর এক কর্মসূচি ঘোষণা করতে থাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ১৪ জুলাইয়ের পর পায় নতুন মাত্রা।
সেদিন এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনি সুবিধা না পেলে রাজাকারের নাতি-নাতনিরা কি সুবিধা পাবে?’
সেই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্লোগান উঠে, ‘তুমি কে, আমি কে—রাজাকার, রাজাকার’, পরে স্লোগান সংশোধন করে যোগ করা হয়, ‘কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিস আহমেদ হিমেল টাইমসকে বলেন, এই ঘটনার পরই তার কাছে মনে হয়েছে, আন্দোলনটি আর কোটায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৃহত্তর রাজনৈতিক গণআন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠি-রড-ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করে ছাত্রলীগ। তার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই দেশের সব ক্যাম্পাসে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। সেদিন বিশেষ করে রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনে স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে। দুই হাত প্রসারিত করে গুলির সামনে দাঁড়ানো তরুণ গণঅভ্যুত্থানের মুখ হয়ে উঠেন।
হিমেল বলেন, ‘আবু সাঈদ নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পরই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে আন্দোলন আর সহজে থামানো সম্ভব হবে না।’
১৮ জুনের কমপ্লিট শাটডাউনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৫ জনেরও বেশি মৃত্যুর পর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয় কোটা বাতিলের দাবি। ১৯ জুন সারা দেশে কারফিউ জারি করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি।
পুরোটা সময়ে পুলিশের নির্বিচারে গুলির ভিডিও এসেছে সামাজিক মাধ্যমে। পয়েন্ট ব্ল্যাক রেঞ্জ থেকেও গুলি করা হয়েছে, দৌড়ে যাওয়া বা ভয়ে কুঁকড়ে থাকা নিরস্ত্র মানুষকেও গুলি করা হয়েছে।
জুলাইয়ের শেষে আটক হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় জন সমন্বয়ক মুক্তি পাওয়ার পর ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল জনসভায় আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকার পতনের একদফা দাবি ঘোষণা করেন। জবাবে দমন-পীড়ন আরও তীব্র হলে ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা আসে। সেদিন দুপুরে লাখো মানুষ রাজধানীমুখী পদযাত্রায় অংশ নিলে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।
ক্ষোভের শেকড় আরও গভীরে
অর্থনীতির গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য টাটইমসকে বলেছেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি ছিল দুর্নীতি, বৈষম্য, নিপীড়ন ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ।’
সমন্বয়ক আসাদুল্লাহ আল গালিব বলেন, ‘আন্দোলনের পেছনে কেবল কোটা ইস্যু কাজ করেনি; বরং দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের ক্ষোভই ছিল মূল চালিকা শক্তি।’
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট। এরপর আরও তিনটি নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু একটি নির্বাচনেও জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেনি।
২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের সবচেয়ে বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর একটি। প্রধান বিরোধী জোটের বর্জনে ১৫৩টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি; বাকি ১৪৭ আসনের ভোট নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় পায়, কিন্তু সেটি ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স আগের রাতেই ভরা হয়।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন আবার বিরোধী জোট বর্জন করে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের নেতাদেরকে ডেকে ‘ডামি’ প্রার্থী হওয়ার নির্দেশ দেন যে কারণে পরে এই ভোটটি ‘ডামি নির্বাচন’ আখ্যা পেয়েছে।
সাবেক সমন্বয়ক নাজমুস সালেহী বলেন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, মেধার অবমূল্যায়ন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার সংকট এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরিণতি।’
গোটা শাসনামলে বিপুল সংখ্যক মানুষকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া, তাদের কারও কারও আর ফিরে না আসা, বিচার বহির্ভুত হত্যার একের পর এক ঘটনায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সমালোচনা জয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নথি অনুযায়ী ২০০৯ থেকেই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নিয়মিত উদ্বেগে পরিণত হতে থাকে।
র্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ক্রমবর্ধমান অভিযোগের মধ্যে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র বাহিনীর সে সময়কার ও সাত সাবেক ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে জানায়, র্যাবের বিরুদ্ধে ছয় শতাধিক গুম এবং ২০১৮ থেকে প্রায় ছয় শতাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ছিল।
২০১৮ সালে জঙ্গি ও মাদকবিরোধী অভিযানে শতাধিক মানুষ নিহত হয়, সে বছরই ৯৮টি গুমের অভিযোগও নথিভুক্ত হয়।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, ‘বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, ক্রসফায়ার, গুম, লুটপাট এবং রাষ্ট্রের দমনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। আর কোটা আন্দোলন দমনে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত সেই ক্ষোভকে বিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যায়।’
ব্যাংক খাতে ঋণ কেলেঙ্কারি, খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই একটি গোষ্ঠীর কাছে কেন্দ্রীভূত থাকা, পুঁজিবাজারে ধস আওয়ামী লীগ আমলের আরেক ঘটনা।
২০১০-১১ সালে শেয়ারবাজার ধসে লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়; ২০১২ সালে সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা; একই সময়ে বেসিক ব্যাংকেও প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
পরে ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে তুলে নেওয়া এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ সামনে আসে।
বাংলাদেশে আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে রয়টার্স, ব্লুমবার্গ ও ফিনান্সিয়াল টাইমসে প্রতিবেদন আসে; পি কে হালদারের হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ কানাডা-ভারত পর্যন্ত তদন্তের বিষয় হয়; পানামা ও প্যান্ডোরা পেপার্সে একাধিক বাংলাদেশির অফশোর সম্পদের তথ্য প্রকাশ পায়।
২০২৪ সালের কোরবানির ঈদে এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান ইফতির ১৫ লাখ টাকায় ছাগলের বুকিং দেওয়ার খবর আসে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘এটি কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিতর্ক না, সেটি ছিল রাষ্ট্রের জবাবদিহি ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।’
তিনি বলেন, “অতীতে রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে দেশে একটি ‘চোরতন্ত্র’ গড়ে উঠেছিল, জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটানো।’
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নানা ধরনের অগ্রহণযোগ্য আচরণেও মানুষ রুষ্ঠ ছিল বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে বুয়েটে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে।
অর্থনৈতিক চাপ
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০২১ সাল পর্যন্ত অর্থনীতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ঠ হতে থাকে মানুষ। সেই সঙ্গে রিজার্ভের টানা পতন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষকেও আতঙ্কিত করে।
৫০ বিলিয়ন ডলার ছুঁই ছুঁই অবস্থা থেকে দুই বছরের কিছু বেশি সময়ে মোট রিজার্ভ ২০ বিলিয়নে নেমে আসে। এই সময়ে অর্থপাচারের অভিযোগ বড় হয়ে উছে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিদ্যুৎ উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও এই সময়ে ফিরে আসে লোডশেডিং, যা সরকারের এত সফরের সাফল্যের দাবিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।


