তালিকাতেই সীমাবদ্ধ পুনর্বাসন: বন্যাকবলিত চট্টগ্রামে হাহাকার

তালিকাতেই সীমাবদ্ধ পুনর্বাসন: বন্যাকবলিত চট্টগ্রামে হাহাকার
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত জনপদে পুনর্বাসনের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা শুরু হয়নি। সরকারি দপ্তরগুলো ক্ষয়ক্ষতির দীর্ঘ তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন মহলে পাঠালেও মাঠ পর্যায়ে এখনো পৌঁছায়নি প্রয়োজনীয় অর্থ বা সরঞ্জাম। ফলে ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা লাখো মানুষের বাড়ছে হাহাকার।

বিশেষ করে শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামো খাতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সরকারি বিশেষ বরাদ্দের কোনো বিকল্প নেই। তবে বাস্তবতা হলো, বড় বড় অঙ্কের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান কেবল ফাইলের পাতাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন জানিয়েছেন, ক্ষতির পুরো প্রতিবেদন সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। পুনর্বাসনের কাজও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করার চেষ্টা চলছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় প্রাথমিকভাবে ১৮২টি বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানানো হলেও নিবিড় যাচাই-বাছাইয়ের পর বর্তমানে ১৩০টি বিদ্যালয়ের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরী ছাড়াও সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি এবং হাটহাজারী উপজেলার স্কুলগুলো সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফিরোজ আহাম্মদ বলেন, অধিকাংশ বিদ্যালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করায় আসবাবপত্র, আলমারি এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। যদিও ভবনগুলোর কাঠামোগত ক্ষতি তুলনামূলক কম, তবে পাঠদানের উপযোগী পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বড় অঙ্কের সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘আমরা চূড়ান্ত তালিকা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারকে এবং অধিদপ্তরে পাঠিয়েছি। সোমবারও ১৩০টি স্কুলের নাম পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পুনর্বাসনের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো বরাদ্দ আমাদের হাতে পৌঁছায়নি।’

সার্কিট হাউসে এ বিষয়ে বৈঠক হলেও অর্থ ছাড়ের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা মেলেনি বলে জানান এই শিক্ষা কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন

বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড কৃষি ও মৎস্য খাতে। চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় কৃষি খাতে প্রায় ৪০১ কোটি ৯১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ২১ হাজার ১১৭ হেক্টরেরও বেশি ফসলি জমি আক্রান্ত হওয়ায় প্রায় দেড় লাখ টন ফসল নষ্ট হয়েছে, যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫১০টি কৃষক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। বিশেষ করে আউশ ধান ও গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ সম্পূর্ণ ধুয়ে মুছে গেছে।

বাঁশখালীর কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমার প্রায় পাঁচ একর জমিতে আউশ ধান আর মৌসুমি সবজির আবাদ ছিল। বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে। জমিতে এখনো কাদা, নতুন করে চাষ করার মতো অবস্থাও নেই। ব্যাংক আর এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলাম, এখন সেই ঋণ কীভাবে শোধ করব বুঝতে পারছি না। সরকারি সহায়তার কথা শুনছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ এসে কোনো সহযোগিতা করেনি।’

মৎস্য খাতের চিত্র আরও ভয়াবহ। বিভাগের ২১০ কোটি ১০ লাখ টাকার মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, যার সিংহভাগই চট্টগ্রাম জেলায়। বন্যায় ২৩ হাজার ৬১০টি পুকুর এবং ৭৮৯টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে যাওয়ায় মাছ ও পোনা ভেসে গেছে, যার বাজারমূল্য কয়েকশ কোটি টাকা।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৬ হাজার ৮৩০ টনের বেশি মাছ এবং ৭ কোটি ৬৬ লাখ মাছের পোনা বন্যার স্রোতে হারিয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, ‘পুনর্বাসনের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো বরাদ্দ আমরা পাইনি। এই অনিশ্চয়তায় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।’

সাতকানিয়া এলাকার মৎস্য চাষী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কয়েক বছরের সঞ্চয় দিয়ে মাছের খামার গড়ে তুলেছিলাম। বন্যার রাতে পুকুরের সব মাছ আর পোনা স্রোতের সঙ্গে ভেসে গেছে। এখন আবার নতুন করে পোনা ছাড়তে হলেও অনেক টাকা লাগবে। কোনো পুনর্বাসন সহায়তা না পেলে আমাদের মতো ছোট চাষিদের পক্ষে আবার দাঁড়িয়ে যাওয়া খুব কঠিন।’

যোগাযোগ ব্যবস্থার নাজুক দশা পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং এলজিইডির তথ্যমতে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় মোট ২ হাজার ২১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু চট্টগ্রাম জোনেই ২১২ দশমিক ৯৪ কিমি সড়ক বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যায় প্রায় ৮৪৬টি সড়কের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, যা মেরামতে অন্তত ৪২৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

আবাসন খাতে ক্ষতির পরিমাণও কম নয়। জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ হাজার ৫০৬টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২০ হাজার ১৯৩টি ঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৮৫ হাজার, প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন মানুষ। গৃহহীনদের সহায়তায় জেলা প্রশাসন থেকে সম্প্রতি ৮০০ বান্ডিল টিন এবং ২৪ লাখ টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে, যা বিশাল চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

বন্যার ভয়াবহতার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে নদী ও খালের পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। কর্ণফুলী ও সাঙ্গু নদীর উজানে এবং শাখা খালগুলোতে নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় পলি জমে নদীর গভীরতা কমে গেছে। ফলে অতিবৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত হতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় নিচ্ছে, যা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বন্যার সৃষ্টি করছে।

চট্টগ্রামের এই মানবিক সংকটে এখন ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ৯ আগস্ট তার চট্টগ্রাম সফরের কথা রয়েছে। সূচি অনুযায়ী, তিনি বাঁশখালী, ফটিকছড়ি এবং হাটহাজারীর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করতে পারেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad