আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বড় পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি জানিয়েছেন, সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে এবং আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকা সুদসহ ফেরত পাবেন। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ‘হেয়ার কাট’ (আমানতের অর্থ কর্তন) করা হবে না বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।
বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৭১ বিধিতে উত্থাপিত সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহেনা আক্তার রানুর জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে।
এই আইনের আওতায় এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট (এক্সিম) ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। নতুন ব্যাংকের অধীনে সব আমানতকারীর স্বার্থ পুরোপুরি সংরক্ষিত থাকবে।
অর্থমন্ত্রী পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল উল্লেখ করে বলেন, ‘আমানতকারীদের আশ্বস্ত করতে চাই, তারা সুদসহ তাদের টাকা ফেরত পাবেন। যেহেতু সুদসহ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে, তাই ‘হেয়ার কাট’-এর কোনো প্রশ্নই আসে না।’
তবে ব্যাংকগুলো বর্তমানে লোকসানে থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগবে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও জানান, আমানত সুরক্ষা আইনের আওতায় সুরক্ষার সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা তদন্তে বিশেষ ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করা হচ্ছে। ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ৫৭ ধারা অনুযায়ী দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি সম্পত্তি ও তহবিল জব্দ, নিলাম বা বিক্রয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের অর্থ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে ‘নো উইন, নো ফি’ ভিত্তিতে নয়টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অর্থ উদ্ধার করা গেলেই কেবল এসব প্রতিষ্ঠানকে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে।
প্রাথমিক পর্যায়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ১১টি মামলার মধ্যে ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এগুলো হলো–এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়েন্ট গ্রুপ এবং সাইফুজ্জামান চৌধুরী সংশ্লিষ্ট গ্রুপ।
এর আগে নোটিশটি উত্থাপনকালে সংসদ সদস্য রেহেনা আক্তার রানু বলেন, সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংকের প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। তাদের আমানতের অর্থ থেকে কোনো ধরনের ‘হেয়ার কাট’ করা যাবে না।
যারা জনগণের টাকা লুট করেছে, তাদের পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই হোক ফিরিয়ে এনে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে এবং টাকা আদায় করতে হবে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের কয়েকটি ব্যাংকের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং মালিকপক্ষের অর্থ পাচারের কারণে লাখ লাখ আমানতকারী নিজেদের টাকা তুলতে পারছেন না। এই টাকা মানুষের বিলাসিতার নয়; এটি বাবার মেয়ের বিয়ের স্বপ্ন, মায়ের চিকিৎসার শেষ ভরসা, শিক্ষার্থীর টিউশন ফি কিংবা পেনশনের সঞ্চয়।
ব্যাংক মানুষের আস্থার জায়গা, সেখান থেকে টাকা লুট হলে মানুষ কোথায় যাবে? মানুষ ব্যাংকে টাকা না রাখলে বিনিয়োগ কমে যাবে এবং দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়বে। টাকার অভাবে অনেকে সময়মতো চিকিৎসাও করাতে পারছেন না। অথচ লুটেরা মালিকপক্ষ বিদেশে পালিয়ে আরামে জীবন যাপন করছে। অসহায় মানুষগুলো বর্তমান সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে।
তিনি এসব ব্যাংক খেকো মালিকদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে দ্রুত গ্রাহকদের টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।


