ঢাকার মিরপুরের শাহ আলী বোগদাদীর মাজারে সাপ্তাহিক জলসা চলাকালে হামলা ও ভাঙচুরের পাশাপাশি ভক্তদের লাঠিসোঁটা দিয়ে বেদম পেটানোর ঘটনা ঘটেছে।
হামলার শিকার মানুষরা এই ঘটনার জন্য স্থানীয় জামায়াতকে দায়ী করছেন। পুলিশও একই কথা বলছে। যদিও জামায়াতের স্থানীয় সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) দাবি করেছেন, তাদের দলের নেতাকর্মীরা এর সঙ্গে জড়িত নন, বরং পুলিশ সেখানে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা এই ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়নি। মাজারের ভক্তরা এ নিয়ে ক্ষোভও জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে হামলার ওই ঘটনা ঘটে, যার রেশ রয়ে গেছে শুক্রবারও। মাজারের লোকজন সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রকাশ্যেই এই ঘটনার জন্য জামায়াতকে দায়ী করেছেন।
প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে শাহ আলী মাজারে একটি সাপ্তাহিক জলসা হয়। সেখানে ঢাকা এবং দেশের নানা প্রান্ত থেকে লোকজন আসেন। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে সেই জলসা চলাকালে হঠাৎ লাঠিসোঁটা হাতে কিছু লোক এসে মারধর শুরু করে।
সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, মাজারের লোকদের বেদম পেটানো হয়, গাঁজা সেবনের অভিযোগ এনে গালাগাল করা হয়। ভিডিওতেই জামায়াত শব্দটি উচ্চারিত হতে শোনা যায়।
প্রশাসন কি জামায়াতে বন্দী?
শুক্রবার মাজার প্রাঙ্গণে বিক্ষুব্ধদের একজন বলছিলেন, ‘প্রশাসন কেন নেই এবং প্রশাসন কি পঙ্গু নাকি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করেছে?’
তিনি বলেন, ‘প্রশাসন কি পঙ্গু, নাকি জামায়াতে বন্দী।’
আরেকজন বলেন, ‘দেশে কি কোনো আইন নেই, যার ফলে জামাত-শিবিরকর্মীরা এভাবে মাজারে এসে ভাঙচুর ও লুটপাট করার সাহস পায়।’
ভক্তরা দাবি করেছেন, তারা যদি পাল্টা মারামারি করতে চাইতেন, তাহলে হামলাকারীরা পার পেত না। কিন্তু তারা শান্তিতে থাকার জন্য তা করেননি।
ভক্তদের অভিযোগ, হামলাকারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাজার দখল করে ভেঙে দেওয়া। ‘তারা টাকা-পয়সা লুট করার লক্ষ্য নিয়ে এসেছিল’- বলছিলেন আরেকজন। হামলাকারীরা ভক্তদের হাত ও পা ভেঙে দিয়েছে- এমন অভিযোগও করেন তারা। বলেন, ৬০ থেকে ৮০ বছর বয়সী মুরুব্বি এবং নারীরাও এই মারধর থেকে রেহাই পাননি।
“হামলাকারীরা শাহ আলী বাবার মাজারের ঐতিহ্যবাহী ‘পিতলের ড্যাগ’ ভেঙে ফেলার বা নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং রওজা শরীফের ভেতরে ঢুকে টাকা-পয়সা লুট করার চেষ্টা চালান,”-এমন কথাও বলা হয়।
মাজারের ভক্তরা দাবি করেন, ‘সিদ্ধি’ তাদের আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির একটি অংশ। তারা বিশ্বাস করেন মাজারটি আউলিয়াদের জন্য তৈরি হয়েছে এবং এটি কোনো রাজনৈতিক দলের জায়গা নয়। তাদের একটাই চাওয়া, তারা যেন ‘ডাল খিচুড়ি খেয়ে’ এবং তাদের নিজস্ব ‘পাগল অধিকার’ নিয়ে মাজার এলাকায় কোনো অত্যাচার ছাড়াই শান্তিতে থাকতে পারেন।
পুলিশও বলছে জামায়াতের কথা
এই ঘটনা নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের দারুস সালাম জোনের সহকারী কমিশনার ইমদাদ হোসেন বিপুল বলেন, ‘মাজারে পুলিশ অভিযান চালায়নি। যেটুকু জানতে পেরেছি বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের লোকজন ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিযান চালিয়েছে।’
গত সপ্তাহে বিএনপি ও যুবদলের কর্মীরাও নিজ উদ্যেগে অভিযান চালিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে পুলিশের কোনো ভূমিকা নেই।’
শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রওজার পূর্ব পাশে যেখানে শুক্রবারে নামাজ পড়ে, সেই জায়গায় বাইরে থেকে আসা কিছু মহিলা ও পুরুষ মাদুর বিছিয়ে গাঁজা সেবন করতে বসেছিল। তখন মাজারের জিয়ারতকারীরাই তাদের সেখান থেকে সরিয়ে মাজার প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেন।’
মিরপুর বিভাগের বিভাগের উপ কমিশনার মো. মোস্তাক সরকার বলেন, মাজার এলাকায় পুলিশ মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গেলে সেখানে কিছু উৎসুক মানুষ নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করে। পরে পুলিশ সেখান থেকে ফিরে আসে।
জামায়াতের এমপির অস্বীকার
যোগাযোগ করা হলে ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতের এমপি ব্যারিস্টার আরমান টাইমসকে বলেন, সেখানে তাদের নেতাকর্মীরা যাননি। এটি পুলিশের অভিযান ছিল।
কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারাই তো সেখানে জামায়াতের অভিযানের কথা বলেছে- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অন্য কেউ বললে তো হবে না। আপনি কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলুন। সুনির্দিষ্ট নাম উল্লেখ না করে ঢালাও কারও কথা বললে তো হবে না।’
তার দাবি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং তিনি তাকে বলেছেন, বাহিনীটি মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়েছিল।
এ বিষয়ে এলাকার এমপি হিসেবে আপনার বক্তব্য কী? এই প্রশ্নে আরমান বলেন, ‘আমরা যেকেনো সহিংসতার নিন্দা জানাই। আমরা কোনো রকমের সহিংসতা ও আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিরোধী।’
মাজার প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের অভিযোগে স্থানীয়রা পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশকেই সেখানে ব্যবস্থা নিতে হবে।’


