নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার চারটি ইউনিয়নে মধুমতী নদীর ভাঙন ও প্লাবন ঠেকাতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প সাত বছরেও শেষ হয়নি। ফলে ভাঙন ও প্লাবিত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে অন্তত ছয় হাজার একর ফসলি জমি ও কয়েক হাজার ঘরবাড়ি।
২০১৯ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ জটিলতা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধার কারণে কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রতি বছরই নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, বছরের পর বছর ধরে নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে ফসলের ক্ষতি করার পাশাপাশি ঘরবাড়ি ডুবিয়ে দেয়। এছাড়া কয়েক দশকের তীব্র ভাঙনে ইতোমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে মধুমতী নদীর পাড়ের পাকা সড়ক।
এই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ থেকে স্থানীয়দের রক্ষা করতে ২০১৯ সালে তৎকালীন সরকার লোহাগড়া উপজেলার কোটাকোল থেকে ঘাঘা চেয়ারম্যানের বাড়ি (ধলইতলা) পর্যন্ত ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয় ৩৪২ কোটি টাকা।
প্রকল্প অনুমোদনের পর স্থানীয়দের আপত্তি এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘ চার বছর কোনো কাজ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০২৩ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে প্রকল্পের কাজ শুরু করে। ২০২৫ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই দফায় সময় বাড়ানো হয়েছে।
তবে সময় বাড়লেও কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীরগতির। বর্তমানে কিছু অংশে খনন কাজ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না।
প্রকল্পের ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা। বেড়িবাঁধ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা ১৬১ জন ক্ষতিগ্রস্ত মালিকের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৪ জন তাদের ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। উপজেলার চারটি ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রামের ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি রক্ষায় স্থানীয়রা দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানালেও, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বক্তব্য: জমির ক্ষতিপূরণ পুরোপুরি না পেলে তারা কোনোভাবেই কাজ চলতে দেবেন না।
কাজের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এস এ ইউবি জে বি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. মিলন আলী জানান, বেড়িবাঁধের কাজ নিয়ে তারা বর্তমানে কিছুটা বিপাকে আছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনো তাদের কাছে পুরো জমি বুঝিয়ে দেয়নি। এর ফলে কাজ করতে গেলে তারা স্থানীয় মানুষের বাধার মুখে পড়ছেন। স্থানীয়রা ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত কাজ করতে দিতে রাজি নন।
মিলন আলী বলেন, এই প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু অংশে কাজ চালানো হচ্ছে। তবে পুরো জমি বুঝে পেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, প্রকল্পটি ২০১৯ সালে গৃহীত হলেও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২২ সাল পর্যন্ত এর কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরে ২০২৩ সাল থেকে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হলেও স্থানীয় বাধা ও জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ঠিকাদার নিয়মিতভাবে কাজ করতে পারছেন না।
তিনি আরও জানান, লাল পতাকা দিয়ে জমি চিহ্নিত করা হলেও পরে তা তুলে ফেলা হচ্ছে। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হোসনে আরা তান্নি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ইতোমধ্যে একাধিকবার জমি চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে তাদের ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি আবেদনকারীদের কাগজপত্রও যাচাই করা হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে সবাইকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।


