ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুসকে ঘিরে চলছে উৎসবের আমেজ। বুধবার সকাল ৮টা থেকে নগরীতে শুরু হতে যাচ্ছে দেশের বৃহত্তম ও ঐতিহাসিক ৫৫তম জশনে জুলুস।
ঐতিহাসিক এই জুলুসের আয়োজন করেছে আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট এবং এতে সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ।
ট্রাস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মনজুর আলম বলেন, ১৯৭৪ সালের ১২ রবিউল আউয়াল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ্’র (রহ.) দিকনির্দেশনায় চট্টগ্রামে প্রথম এই জশনে জুলুসের সূচনা হয়েছিল। বলুয়ারদীঘি পাড় খানকাহ শরিফ থেকে শুরু হওয়া সেই প্রথম জুলুসের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই এবার ৫৫তম জুলুস অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এবার জুলুসে চট্টগ্রাম ও আশেপাশের জেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ৫০ লাখের বেশি মানুষের সমাগম ঘটবে।
এবারের ঐতিহাসিক ৫৫তম জুলুসে নেতৃত্ব দেবেন আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ। এতে অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত থাকবেন সৈয়দ মুহাম্মদ কাসেম শাহ ও সৈয়দ মুহাম্মদ আকিব শাহ।
জুলুসে অংশ নিতে চট্টগ্রাম নগর ও জেলার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মুসল্লিরা আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী- কক্সবাজার, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়া, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি, পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং কুমিল্লা, ফেনী, মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ এই জুলুসে শামিল হবেন।
আনজুমান ট্রাস্টের পক্ষ থেকে জুলুসের জন্য একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী- সকাল ৮টায় নগরের ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকা কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া থেকে র্যালি শুরু হবে।
র্যালিটি বিবিরহাট থেকে মুরাদপুর হয়ে ষোলশহর ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা, দামপাড়া, লালখান বাজার ও টাইগারপাস হয়ে পুনরায় একই পথে ফিরে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা সংলগ্ন জুলুস ময়দানে গিয়ে সমবেত হবে।
নগরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়ক ও মোড় প্রদক্ষিণ শেষে জামেয়া মাঠে জশনে জুলুসটি শেষ হবে। সেখানে মাহফিল, জোহরের নামাজ এবং দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি, শান্তি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর ১২টায় মূল মাহফিল শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
জুলুস উপলক্ষে নগরজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সিএমপির পক্ষ থেকে বিশেষ ট্রাফিক নির্দেশনা এবং কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সই করা এক বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ধর্মীয় র্যালি ও মাহফিলের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সব ধরনের অস্ত্র বহন, প্রদর্শন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এছাড়া র্যালিতে কোনো প্রকার মূর্তি বা কুশপুত্তলিকা প্রদর্শন করা যাবে না। র্যালির শুরু থেকে মাহফিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সাথে সিএমপি জানিয়েছে, র্যালি চলাকালে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।
জুলুসের সার্বিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার তদারকিতে পুলিশের পাশাপাশি আনজুমান ও গাউসিয়া কমিটির প্রায় ১০ হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করবেন।
শৃঙ্খলা রক্ষার্থে আয়োজক কমিটি এবার কিছু কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে- জুলুসের ভেতর কোনো ধরনের ড্রামসেট নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। র্যালিতে নারীদের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এবং জুলুস চলাকালে উপর থেকে বা বাইরে থেকে কোনো ধরনের খাদ্যদ্রব্য নিক্ষেপ করা যাবে না।
জুলুসকে কেন্দ্র করে বন্দরনগরীর মোড়ে মোড়ে সুসজ্জিত তোরণ, ব্যানার ও ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। প্রধান সড়কের বিভাজক ও সড়কদ্বীপগুলোতে শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং আনজুমানের ধর্মীয় পতাকা। রাতের বেলা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বর্ণিল আলোকসজ্জা করা হয়েছে, যা রাতের চট্টগ্রামকে এক নতুন রূপ দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় মাইক ও সাউন্ড সিস্টেমে নাতে রাসুল ও মিলাদুন্নবীর গজল প্রচার করা হচ্ছে।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে জামেয়া মাদরাসা ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক অস্থায়ী শৌচাগার স্থাপন করা হয়েছে। একই সাথে মুসল্লিদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সেবা, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ এবং শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত বুথের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।


