স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়া সদর উপজেলার শান্তিডাঙায় বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়। এই ৪৭ বছরে ইবির ইতিহাসে এসেছেন ১৪ জন উপাচার্য। তবে এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে ১২ জনই পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব শেষ করতে পারেননি।
উপাচার্যদের নিয়োগ-বাণিজ্য, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ বিবিধ অভিযোগ উঠলে তাদের হয় পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে অথবা অপসারণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, জগন্নাথ ও যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও উপাচার্য পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর ইবির প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান এ.এন.এম মমতাজ উদ্দিন চৌধুরী, যিনি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩১ জানুয়ারি থেকে ১৯৮৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৮৭ সালে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সঙ্গে বিরোধের জেরে আন্দোলনে মেয়াদ পূরণের মাত্র চার দিন পূর্বে ১৯৮৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি অপসারিত হন। তার নামে ইবিতে একটি শিক্ষক আবাসিক ভবনের নামকরণ করা হয়েছে।
এরপর দ্বিতীয় উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। তিনি ২৮ ডিসেম্বর ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ক্যাম্পাস গাজীপুর থেকে কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরে অবদান রাখেন। তবে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, যৌন কেলেঙ্কারি, শিক্ষকদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ চাপে ১৭ জুন ১৯৯১ সালে তাকে অব্যাহতি নিতে হয়।
তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মাদ আব্দুল হামিদ ১৮ জুন ১৯৯১ থেকে ২১ মার্চ ১৯৯৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। অবৈধ নিয়োগ দিতে রাজি না হওয়ায় স্থানীয় চাকরিপ্রার্থীরা রোজার মধ্যে তাকে তিন দিন অবরুদ্ধ করে রাখলে তিনি রাতের আঁধারে ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যান।
ইবির চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মাদ ইনাম-উল হক ৯ মে ১৯৯৫ থেকে ২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রকৌশল অনুষদে কম্পিউটার, তড়িৎ ও রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগ চালু করেন। ১৯৯৭ সালে আন্দোলনকারীরা তাকে লাঞ্ছিত করলে তিনি আর ফিরে আসেননি।
পঞ্চম উপাচার্য হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কায়েস উদ্দিন ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ থেকে ১৯ অক্টোবর ২০০০ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তথ্য প্রযুক্তি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু করলেও দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে তিনি পদত্যাগ করেন।
ষষ্ঠ উপাচার্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মাদ লুৎফর রহমান ২০ অক্টোবর ২০০০ থেকে ৩ নভেম্বর ২০০১ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের এক বছরের মাথায় পদত্যাগ করেন।
সপ্তম উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান ১০ ডিসেম্বর ২০০১ থেকে ২ এপ্রিল ২০০৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করলেও আন্দোলনের মুখে মেয়াদ শেষের দুই বছর আগে অপসারিত হন।
অষ্টম উপাচার্য হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম রফিকুল ইসলাম ৩ এপ্রিল ২০০৪ থেকে ১০ জুলাই ২০০৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক সমিতি দুর্নীতি ও অধ্যাদেশ লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
নবম উপাচার্য হিসেবে প্রথমবারের মতো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়োগ পান অধ্যাপক ফয়েজ মুহাম্মাদ সিরাজুল হক। তিনি ১০ আগস্ট ২০০৬ থেকে ৮ মার্চ ২০০৯ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেন।
দশম উপাচার্য ইবির অধ্যাপক এম আলাউদ্দিন ৯ মার্চ ২০০৯ থেকে ২৭ ডিসেম্বর ২০১২ পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে সায়েন্স ভবন ও শহীদ মিনার নির্মাণ করলেও দুর্নীতির অভিযোগে অপসারিত হন।
একাদশ উপাচার্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল হাকিম সরকার ২৭ ডিসেম্বর ২০১২ থেকে ৩০ জুন ২০১৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই আচার্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তাকে অপসারণ করেন।
এরপর দ্বাদশ উপাচার্য হিসেবে ইবির অধ্যাপক মো. হারুন-উর-রশিদ আসকারী ২১ আগস্ট ২০১৬ থেকে ২০ আগস্ট ২০২০ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি উপাচার্য হিসেবে পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে পেরেছেন।
রশিদ আসকারীর পর ত্রয়োদশ উপাচার্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ আব্দুস সালাম ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে ৯ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগে তিনি পদত্যাগ করেন।
সর্বশেষ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ চতুর্দশ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। তার আমলে শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো হয়নি।
দেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও এখানে সর্বাধিক নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইবি পেয়েছে মাত্র তিনজন উপাচার্য।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পরিবর্তনের গুঞ্জন শুরু হয়েছে এবং এবার শিক্ষার্থীরা নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য চাচ্ছেন।


