‘হুদা’সমগ্র কিংবা ‘হুদা’বিদ্যার অভিধান

‘হুদা’সমগ্র কিংবা ‘হুদা’বিদ্যার অভিধান
হুদা কমিশন। প্রতীকী গ্রাফিক্স: এআই/টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের রাজনীতি যতটা না আদর্শ আর নীতির, তার চেয়ে বেশি নামের খেলা। অনেকে নামে ভারী, কাজে হালকা। কিন্তু ‘হুদা’ এমন একটি নাম যা শুধু রাজনীতির পাতায় নয়, হাস্যরসের অ্যালবামেও অমর হয়ে আছে। এ যেন এক রাজনৈতিক ধারা, এক চরিত্রধর্মী উপাখ্যান, যা প্রতিবার নির্বাচনের মৌসুমে ফিরে আসে নতুন মোড়কে, পুরনো চক্রান্তে।

‘হুদা’ নিয়ে আলোচনায় শুরুতেই একটু ভাষার পাঠ নিয়ে নেওয়া যায়। শব্দটি আরবি মূলধারার, যার অর্থ: সঠিক পথ, পথনির্দেশনা, হেদায়েত। ইসলামী পরিভাষায় ‘হুদা’ মানে হল সেই আলো যা অন্ধকারে পথ দেখায়, যে পথ সত্য ও ন্যায়ের দিকে নিয়ে যায়। অর্থাৎ ‘হুদা’ হওয়া মানেই হওয়া উচিত ছিল: আদর্শের দিশারি, ন্যায়ের পথিক।

আফসোস!

আমাদের রাজনীতির মাঠে; কখনো সরাসরি, কখনো নেপথ্যের খেলোয়াড় হয়ে, যারা ‘হুদা’ নাম ধারণ করেছেন, তারা বেশিরভাগ সময় হেঁটেছেন ঠিক তার উল্টো পথে। আলো থেকে অন্ধকারে, আদর্শ থেকে স্বার্থে, আর হেদায়েত থেকে বিভ্রান্তিতে। তারা নামের ‘হুদা’ হলেও কার্যত ‘গোমরাহ’।

এমন একজন ‘হুদা’ ছিলেন ব্যারিস্টার। বাংলাদেশে বিটিভির পর্দায় বিবিসি-সিএনএনের আমদানিকারক। এজন্য সাধারণে প্রশংসা পেয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়ার মন্ত্রী হয়েও শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সমর্থন করে লীগারদের বাহবাও পেয়েছেন। তবে হারিয়েছেন মন্ত্রিত্ব, চক্ষুশূল হয়েছেন নিজ দলের।

অংকে পাকা এই ‘হুদা’ অবশ্য তার দল থেকে আবার মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু দল আবার বিপদে পড়ার পর ‘ইউটার্ন’। কখনো সরকারবিরোধী, কখনো সরকারপক্ষ, কখনো নিজের দলের বিরুদ্ধে, কখনো নতুন দল গঠন করে, আবার সেটিও ভেঙে বাংলাদেশে আলোচিত এই ‘হুদা’।

তার স্ত্রী-ও একজন ‘হুদা’। তিনিও ছিলেন খ্যাতিমান আইনজীবী। পরে কিছু মামলায় আলোচনায় আসেন। তাদের কন্যা আরেকজন ‘হুদা’। বাবার রাজনৈতিক দলের হাল ধরেছিলেন। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে লাপাত্তা।

আরও পড়ুন

রাজনীতিতে এই এক ‘হুদা’ পরিবার। ব্রিটিশ আমল থেকে উপমহাদেশের রাজনীতিতে আরো অনেক ‘হুদা’ ছিলেন, আছেন। গত দুই যুগে ‘হুদা’রা অবশ্য বেশি আলোচিত রাজনীতির রেফারি হিসেবে। নামের অবাক করা মিলে পরপর তিন ‘হুদা কমিশন’ পেয়েছে বাংলাদেশ।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় জরুরি সরকার যখন জরুরিভাবে একগুচ্ছ সৎ ও নিরপেক্ষ মুখ খুঁজছিল, তখন তার হাতেই ধরা পড়েছিল ‘সাময়িক স্বচ্ছতার’ লাঠি। মোটামুটিভাবে তিনি উৎরে যেতে পেরেছিলেন।

এরপর এলেন আরেক ‘হুদা’। তার সময়ে সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন যেখানে ভোটের দরকারই হয়নি। একশ ৫৩ জন প্রার্থী আগেই জিতে গিয়েছিলেন। জনগণের চাওয়া-পাওয়া তখন টেবিলের নিচে আর ভোটের ব্যালট ছিল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। এই ‘হুদা’ ছিলেন এমন এক জাদুকর, যিনি ভোট না নিয়েই সরকার বানাতে পারতেন।

পরপর দুই ‘হুদা কমিশন’-এর পর বাংলাদেশ পেয়েছিল আরেক ‘হুদা কমিশন’। কারণ এবার যার হাতে রেফারির বাঁশি, তিনিও যে ‘হুদা’। পূর্বসূরী ‘হুদা’র চেয়ে তিনি এক কাঠি সরেস। নির্বাচনে তিনি এমন এক ম্যাজিক দেখালেন, যেখানে ভোটাররা সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলেন যে তাদের ভোট রাতেই পড়ে গেছে! ব্যালট পেপারগুলো যেন স্বপ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।

সেই ভোটে একজন পরিচিত পেলেন ‘নিশিভোটকন্যা’ হিসেবে। আর নতুন প্রজন্ম রেফারিকে চিনলো ‘নিশিভোটহুদা’ নামে।

সর্বশেষ, রাত না হলেও সন্ধারাতেই জনসমক্ষে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। তবে এবার ফেসবুক লাইভের মূল চরিত্র হিসেবে।

‘হুদা’ আসলে শুধু এক নাম নয়, এক প্রতীকি চেতনা। কখনো মন্ত্রী, কখনো কমিশনার, কখনো বিচারাধীন ব্যক্তি। রাজনীতিতে তার উপস্থিতি মানেই থাকবে আলোচনা, হট্টগোল, এবং শেষ পর্যন্ত একটুখানি কমেডি। এই নামটি দিয়ে নাটক লেখা যায়, উপন্যাসের চরিত্র গড়া যায়, এমনকি একটি গবেষণা থিসিসও হতে পারে: ‘দ্য হুদা ডকট্রিন: ডেমোক্রেসি ইন ডিল্যুশন’।

এইসব হুদাদের দেখে একটা কথা খুব মনে হয়: বাংলাদেশে রাজনীতির সব গোলকধাঁধায়, কিছু না পারুক, ‘হুদা’ ঠিকই আলোচনায় থাকবে। কারণ নামটা এমন যেটা শুনলেই বোঝা যায়, সামনে কোনো না কোনো ঝামেলা আছে।

তবে একটিই অনুরোধ, ভবিষ্যতে কেউ যদি রাজনীতিতে কিংবা রাজনীতির রেফারি হিসেবে ‘হুদা’ নামে আত্মপ্রকাশ করেন, তাকে অন্তত একটি কোর্স করতে হবে: ‘হাস্যরসহীন হুদাগিরি বর্জন: একটি বাস্তববাদী রাজনৈতিক কর্মশালা’।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে ‘হুদা’ এক অবিচ্ছেদ্য শব্দ। হয়তো আগামীতে কেউ একে বাদ দিতে চাইবে, কিন্তু ‘হুদা’র মতো নাম কি আর বাতিল হয়? নামেই তো ইতিহাস! আর ইতিহাস মানেই তো ‘হুদা’!

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad