মানবাধিকার সংগঠন অধিকার বুধবার ২০২৫ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।প্রসঙ্গত, অধিকারের প্রতিষ্ঠাতা আদিলুর রহমান খান বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বিচারে হত্যার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের অন্যান্য অভিযুক্ত ব্যক্তি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশবিরোধী অপতৎপরতা চালাচ্ছেন এবং দেশে থাকা সমর্থকদের উসকানি দিচ্ছেন।
ভারত সরকারের বক্তব্য ও অবস্থান থেকে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সম্মতি রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বছর। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
সংগঠনটি বলছে, এই সরকারের অন্যতম দায়িত্ব ছিল বিচার ও সংস্কারের পাশাপাশি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।
অধিকার বলেছে, শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত ও প্রহসনমূলক। সে কারণে আসন্ন নির্বাচন জনগণের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ছিল। তবে তফসিল ঘোষণার একদিন পরই নির্বাচনী প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হত্যাকারীরা ভারতে পালিয়ে গেছে। গুলিবিদ্ধ শরিফ ওসমান হাদী ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা বেড়েছে বলেও অভিযোগ করেছে অধিকার। একই সময়ে ভারত থেকে অবৈধভাবে দুই হাজার পাঁচশোর বেশি মুসলমান ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও ছিলেন।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্বৃত্তায়নের অবসান ঘটবে বলে আশা করা হলেও ২০২৫ সালজুড়ে চাঁদাবাজি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সহিংসতা অব্যাহত ছিল। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠন, জামায়াতে ইসলামী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অধিকার। জুলাই ও সেপ্টেম্বর মাসে খাগড়াছড়িতে রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং এক মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় এসব ঘটনা ঘটছে বলে মন্তব্য করেছে অধিকার। তবে ১৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার-এর অপশনাল প্রোটোকল অনুমোদন করাকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে অধিকার জানিয়েছে, শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে এক হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন করে গুমের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০২৫ সালে সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং সাংবাদিক হত্যার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে পুলিশি বাধা, রাজনৈতিক হামলা এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সহিংসতার কথাও উঠে এসেছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আগের তুলনায় বাড়লেও অনলাইনে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রচার এবং নারীদের বিরুদ্ধে মানহানিকর প্রচারণা বেড়েছে বলে জানিয়েছে অধিকার।
কারাগারের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বন্দি, নিম্নমানের খাবার ও চিকিৎসাসেবার অভাবে বন্দিরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে উল্লেখ করা হয়। মাদকাসক্ত বন্দিদের জন্য বিশেষায়িত কারাগারের অভাবও তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৫ সালে গণপিটুনির ঘটনাও বেড়েছে, যার অধিকাংশই চুরির সন্দেহে সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় কিশোর ও মানসিক প্রতিবন্ধীরাও রেহাই পাননি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোতে হয়রানিমূলকভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষকে আসামি করার অভিযোগও তুলেছে অধিকার।
নারীর প্রতি সহিংসতা, তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতাও প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
অধিকার বলেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কার্যকর করতে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সংস্কার করলেও গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাদ পড়ায় কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায়কে ভবিষ্যৎ নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ গণমাধ্যমে পাঠানো হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন অধিকারের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি।


