মডেল ও অভিনেত্রী মেঘনা আলমকে আটক ও কারাবন্দীর পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিপন্ন’ এবং ‘বিদেশি কূটনীতিকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা’। কিন্তু বাস্তব চিত্র কি আসলে তা-ই?
জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে মেঘনার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যা পরিণতি পেয়েছিল ‘বাগদান’ পর্যন্ত। পরে রাষ্ট্রদূতের অন্য দেশে আরেকটি বৈবাহিক সম্পর্কের কথা জানতে পেরে মেঘনা নিজেই সে সম্পর্ক থেকে সরে আসেন এবং বিষয়টি রাষ্ট্রদূতের স্ত্রীর কাছে প্রকাশ করেন।
এ পর্যন্ত যা জানা গেছে, তাতে এটি ব্যক্তিগত একটি সম্পর্ক ভাঙনের ঘটনা বলেই মনে হয়।
কিন্তু বিষয়টি এখন আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেই। এটি এখন পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কে। অনেকে একে সরাসরি ‘হানি ট্র্যাপ’ আখ্যা দিচ্ছেন। অথচ তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এমন দাবি করার কোনো সুযোগ নেই।
বরং যুক্তির খাতিরে বলা যায়, যদি এটি সত্যিকার ‘হানি ট্র্যাপ’ হয়, তবে কূটনীতিককে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করে অর্থ বা সুবিধা আদায়ের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা জরুরি। বাস্তবে এমন কিছু এখনো পাওয়া যায়নি।
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল নিজেই বলেছেন, ‘মেঘনাকে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া যথাযথ হয়নি।’
তবু, ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা’র যুক্তিতে তাকে আটক রাখা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগের তদন্ত থাকাকালে একজন নারীকে জনসম্মুখে অপমানিত ও হেয়প্রতিপন্ন করার এই প্রচেষ্টা কি ন্যায়সঙ্গত?
আরো প্রশ্ন, সমাজ কেন মেঘনাকে এককভাবে ‘দোষী’ সাব্যস্ত করছে?
এই প্রবণতার পেছনে অন্তত তিনটি কারণ স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়:
১. নারী যদি নিজেদের পছন্দ-অপছন্দে সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের পছন্দে সম্পর্ক তৈরি বা ছিন্ন করেন, সেটি এখনও সমাজের অনেকে মেনে নিতে পারেন না। আর তিনি যদি হন মিডিয়ার কেউ (নারীর জন্য এ পেশাকে অনেকেই এখনো ‘সন্দেহজনক’ মনে করেন), তবে যেন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণ ছাড়াই সত্য বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা আরও বাড়ে।
২. এখনো অনেকে পুরুষের চারটি বিয়ে ও ‘দাসী সঙ্গ’কে ধর্মের নামে জায়েজ করতে চান। মেঘনা যখন জানলেন যে, রাষ্ট্রদূতের আরেকজন স্ত্রী রয়েছে, তখন তিনি সে সম্পর্ক থেকে সরে দাঁড়ালেন। অর্থাৎ, তিনি যেন ওই ধর্মীয় বিয়ের সহনশীলতা ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। এটিও অনেকের কাছে মেঘনার ‘অপরাধ’।
৩. বাংলাদেশের কিছু মানুষের কাছে ধর্মীয় সংহতির কারণে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ইত্যাদি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা যেন প্রশ্নাতীত। এই মানসিকতা থেকে তারা ধরেই নেন যে ‘হিজ এক্সেলেন্সি’ সর্বদাই নির্দোষ, আর যতো দোষ, সব মেঘনাদের।
এ পর্যায়ে মেঘনা ও রাষ্ট্রদূতের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক ধরে নিলেও, এতে উভয়ের সম্মতি থাকলে এবং এদেশে এটি ‘পরকীয়া’ হিসেবে গণ্য হলেও– এর শাস্তি কি শুধুই মেয়েটির জন্য সংরক্ষিত?
বলা ভাল, সৌদি আইনে এটি ‘ব্যভিচার’ ও ‘মৃত্যদণ্ডযোগ্য অপরাধ’ হলেও বাংলাদেশে তা প্রযোজ্য নয়।
এরপরেও সৌদি আইনে মেঘনা এজন্য অপরাধী হলে একই ‘অপরাধে’ রাষ্ট্রদূত কি তার দেশে বিচারের মুখোমুখি হবেন?
স্যোশাল মিডিয়ায় মেঘনাকে যারা নিত্য অশ্লীল গালাগালে ধুয়ে দিচ্ছেন, তারা কি জানেন, সৌদি আরবে হাজার হাজার বিদেশি নারী গৃহকর্মী কীভাবে নিপীড়নের শিকার হন? বিশেষ করে, তাদের গৃহকর্তাকে কি কখনো এ জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে? কোথাও কী এ সংক্রান্ত কোনো সংবাদ এসেছে?
একজন নারী যখন ‘না’ বলেন, তখন তিনি নিজের আত্মমর্যাদাই তুলে ধরেন, বেরিয়ে আসেন প্রাক্তন সম্পর্ক থেকে, আর তখনই পুরুষ শাসিত সমাজের চোখে তিনি হন ‘চরিত্রহীনা’—দিন শেষে এটিই বাস্তবতা।
আবার মেঘনা ইস্যুতে এসব প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে একে ‘হানি ট্র্যাপ’ ধোঁয়াশা নয়, বরং এটি একজন নারীর আত্মরক্ষার প্রয়াস—এমনটাও মনে করছেন অনেকে।
দৃশ্যত, তাদের এই ভাবনা রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মীয় মোড়কে লুকিয়ে থাকা কুশীলবদের অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।
তদন্ত হোক, বিচার হোক। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে ‘অপরাধী’ বানানোর সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সমাজকে কোথায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে, মিলিয়ন ডলারের এ প্রশ্নটি বহাল রইল।


