সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে এখন বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুম চললেও কৃষকদের মধ্যে উৎসবের পরিবর্তে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ। একদিকে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আগাম বন্যার সতর্কবার্তা—এই দুই সংকটে বোরো ফসল রক্ষা নিয়ে শঙ্কিত হাওরপাড়ের মানুষ।
চলতি সপ্তাহে হাওর এলাকায় শুরু হয়েছে বৃষ্টিপাত, ২৭ এপ্রিল থেকে যার তীব্রতা বেড়েছে। পাউবোর তথ্যমতে, আগামী দু’একদিন প্রবল বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এতে সুরমা, কুশিয়ারা, ধনু-বউলাই ও কংস নদীর পানি দ্রুত বেড়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রমের আশংকা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যেসব জমির ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো ২৮ এপ্রিলের মধ্যে কেটে ফেলতে কৃষকদের অনুরোধ জানিয়েছিল পাউবো। কিন্তু এ সময়ে সকল ধান কাটতে পারেননি কৃষকরা। এখন ফসল রক্ষার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে জেলার অন্যতম বড় বোরো ভাণ্ডার ‘দেখার হাওর’। প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর আবাদি জমির এই হাওরের ওপর লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। গত ১২ এপ্রিল টানা বৃষ্টিতে হাওরের ২০ শতাংশ জমি তলিয়ে গেলে স্থানীয়দের চাপে উথারিয়া বাঁধ কেটে পানি নামানো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় সেই কাটা অংশ দিয়েই পুনরায় হাওরে পানি ঢুকছে।
বর্তমানে কৃষকরা কোমর সমান পানিতে নেমে দিন-রাত পরিশ্রম করে সেই কাটা বাঁধটি পুনরায় জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছেন। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রেখে অপরিকল্পিতভাবে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কারণে প্রতি বছর এই কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। তাদের দাবি, আসামপুর-আস্তমা গ্রামের দুই পাড় সংযুক্ত করে মহাসিং নদীতে রাবার ড্যাম স্থাপন করা গেলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
আস্তমা গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, দেখার হাওরের ফসল ঘরে তুলতে পারলে তা দিয়ে তাদের সংসার চলে। যদি কোনো কারণে হাওরের ফসল তলিয়ে যায় তাহলে দুর্গতির শেষ থাকে না। সেজন্য দেখার হাওরের ফসল রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মান করা তাদের দীর্ঘদিনের দাবি।
একই গ্রামের কৃষক সাজাদ মিয়া জানান, ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জ জেলায় ফসলহানির পর থেকে প্রতিবছর দেখার হাওরের ফসল রক্ষায় কোটি কোটি ব্যয়ে বাঁধ নির্মান করা হয়। কিন্তু এসব বাঁধ নির্মানের সময় পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। ফলে বৃষ্টি হলে হাওরের ভেতরেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসল তলিয়ে যায়। আবার জলাবদ্ধতা নিরসনে বাধ্য হয়ে বাঁধ কেটে দিলে পরবর্তীতে নদীর পানি হাওরে প্রবেশ করে।
এই সংকট নিরসনে কৃষকরা স্থায়ী বাঁধ ও রাবার ড্যামের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।
বুধবার দেখার হাওরের উথারিয়া ক্লোজার পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান ও পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসক জানান, স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে রাবার ড্যাম স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এ বিষয়ে সমীক্ষা যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কয়ছর এম আহমদ বলেন, অস্থায়ী বাঁধের সীমাবদ্ধতা দূর করতে তিনি ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। কৃষকদের মতামতের ভিত্তিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান সংসদ সদস্য।


