ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) রাজস্ব কর্মকর্তা (বাজার ও বিবিধ রাজস্ব পরিবিক্ষণ) মো. আতাহার আলী খানের বেতনের সঙ্গে তার সম্পদ ও জীবনাচরণের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।
সপ্তম গ্রেডের এই কর্মকর্তার বেতন কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন ২৯ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬৩ হাজার ৪১০ টাকা। সব সুবিধা মিলিয়ে বর্তমান বেতন তার ৮৫ হাজার টাকা। অথচ ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে একটি অভিজাত বহুতল ভবনে কয়েক কোটি টাকায় কিনেছেন ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়ি নরসিংদীতেও অনেক টাকা খরচ করে তৈরি করেছেন ডুপ্লেক্স বাড়ি। আছে একাধিক গাড়ি, নামে-বেনামে ব্যাংক হিসাব।
টাইমস অব বাংলাদেশের প্রশ্নে তিনি অবশ্য বলেছেন, এসব সম্পদের কোনো কিছুই তার নিজের নামে নয়। তবে কার নামে গড়েছেন, সেটি বলছেন না।
বৈধ আয়ে এই পরিমাণ সম্পদ করা অসম্ভব বলছেন, তার সহকর্মীরাই। তাহলে কীভাবে তিনি এগুলো গড়েছেন, সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে তার দায়িত্বের পরিধি সামনে এলো।
সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন বিভিন্ন মার্কেটের দোকান বরাদ্দ, মালিকানা বদল তার হাত দিয়ে পাশ হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দোকানের মালিকানা বদল বা বরাদ্দে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সেই কর্মকর্তা। পাশাপাশি চাকরিবিধি লংঘন ও তথ্য গোপন করে নিজের এবং স্বজনদের নামে বরাদ্দ নিয়েছেন একাধিক দোকান।
চাকরি জীবনের পুরো সময় এই কর্মকর্তা কাটিয়েছেন ঢাকায়। অন্যত্র বদলি করা হলেও তিনি তা অগ্রাহ্য করেছেন।
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় আতাহারের পাঁচ বছরের সাজাও হয়েছিল। তবে কয়েকমাস কারাভোগের পর উচ্চ আদালতের আদেশে ছাড়া পেয়ে যান।
দুর্নীতির দায়ে দুইবার চাকরিচ্যুতও হয়েছিলেন এই কর্মকর্তা। আদালতের আদেশেই পরে ফেরেন চাকরিতে। এখন দাবি করছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক রোষানলে পড়েছিলেন তিনি।
সব শুনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘স্বভাবজাত দুর্নীতিগ্রস্তদের ব্যাপারে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ উঠায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তা খতিয়ে দেখা হবে।’
দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেছেন, ‘পূর্বে অভিযুক্ত কারও বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ এলে আবার অনুসন্ধান করা হবে। তদন্তে সত্যতা পেলে বিধিগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আতাহার আলী অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে ‘অবান্তর’ দাবি করেছেন। বলেছেন, ‘কিছু প্রমাণ করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ সরকার আমাকে মামলা দিয়ে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করেছে। এখন কোনো মামলা নেই। উচ্চ আদালত থেকে সব শেষ করেছি।’
নামজারির কথা বলে ঘুষের অভিযোগ
পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিল সুপার মার্কেট, কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্স, ফুলবাড়িয়া সিটি সুপার মার্কেট ও ফুলবাড়িয়ার সুন্দরবন সুপার মার্কেটের একাধিক দোকান মালিক টাইমসকে জানান, মালিকানা বদলির সময়ে এক বছরের ভাড়া ও সমপরিমাণ অর্থ দিলে নামজারি করার নিয়ম। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম মিল নেই, স্বাক্ষর মিলে না এবং দোকান মালিক মৃত হলে ওয়ারিশদের আপত্তি এমন নানা কারণ দেখিয়ে দুই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়তি আদায় করছেন আতাহার।
সদরঘাট হাকার্স মার্কেটের নিচতলায় ৭২০ নম্বর দোকান, নওয়াব ইউসুফ মার্কেটের ১ নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলায় ৬ নম্বর দোকান, নওয়াব ইউসুফ মার্কেটের ২ নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলায় ১ নম্বর দোকান, আহসান মঞ্জিল মার্কেটের তৃতীয় তলায় ৯৫ নম্বর দোকান, দ্বিতীয় তলায় ১১২ নম্বর দোকান, নিচতলায় তলায় ৪৪ নম্বর দোকান, সুন্দরবন মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১৮৫ নম্বর দোকান, কাপ্তান বাজার ২ নম্বর মার্কেটের নিচতলায় ১৩৭ নম্বর দোকান, সিদ্দিকবাজার মার্কেটের নিচতলায় ৯ নম্বর দোকানের নামজারি আটকে আছে মাসের পর মাস।
সিদ্দিকবাজার মার্কেটের প্রায় ২০০ দোকানের নামজারিও নানা অজুহাতে আটকে আছে বলে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।
এই মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মহিন উদ্দিন বলেছেন, ‘কোনো দোকানের নামজারি হয়নি।’
সমিতির সভাপতি মো. ডালিম বলেছেন, ‘সিটি করপোরেশন থেকে বলা হয়েছে নামজারির কাজ শুরু হবে।’
মার্কেটের নিচতলায় ৯ নম্বর দোকান মালিক শরীফ হোসেন শিপলু বলেছেন, আগের অনেক নামজারি বাকি আছে এবং স্বাক্ষর মিলছে না বলে রাজস্ব কর্মকর্তা প্রায় দুই বছরে ধরে তার নামজারি বিলম্ব করছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দোকানের মালিকানা বদলের বিষয় করপোরেশনের মার্কেট শাখার অঞ্চল ১ ও ৪ এর কর কর্মকর্তা মো. শাহজাহান ও আবু নাসের কচি তদারকি করেন। কিন্তু রাজস্ব কর্মকর্তা আতাহার নানা অজুহাত তুলে ফাইল আটকে দেন। দাবিকৃত টাকা না দিলে নামজারি হয় না।
আবু নাসের কচি টাইমসকে বলেছেন, ‘কেউ দোকান বিক্রির আবেদন করলে কাগজ যাচাই ও শুনানি শেষে কনফার্ম করা হয়। রাজস্ব কর্মকর্তা সেটি প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার (সিআরও) কাছে পাঠানোর কথা। কিন্তু অনেক সময় রজস্ব কর্মকর্তা নতুন করে কাগজ যাচাই করেন। তিনি তা না করে কর শাখায় জানতে চাইলে আমরা জবাব দিতে পারি।’ অপর কর কর্মকর্তা শাহজাহানও বলেছেন, ফাইলে রাজস্ব কর্মকর্তার স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়।
নিজের ও স্বজনদের নামে মার্কেটে দোকান
২০০৬ সালের ১৮ অক্টোবর সিটি করপোরেশনে কর কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে বিভিন্ন মার্কেটে একাধিক দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন আতাহার। নিজের পাশাপাশি স্বজনদের নামে ২০টি দোকান বরাদ্দের অভিযোগে তদন্ত করে দুদক।
২০১৫ সালের ২৩ জুলাই সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (বাজার) দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. মনোয়ারুল ইসলামের কাছে প্রতিবেদন দেন। তাতে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আতাহার আলীর নামে দুটি (নম্বর ৪১), গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের (নম্বর ১৬০০), কাপ্তান বাজার কমপ্লেক্সে ২ নম্বর ভবনের নিচতলায় তার বাবা আব্দুস সোবাহানের নামে একটি (নম্বর ১১৭) দোকানের তথ্য রয়েছে। তার মাধ্যমে কাপ্তান বাজার ১ ও ২ নম্বর ভবনে আরও ১৪টি দোকান বরাদ্দের তথ্য পায় দুদক।
আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে দুদক উল্লেখ করে, ‘আতাহারের বিরুদ্ধে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার, মিরপুর শাহ আলী সুপার মার্কেট দোকান বরাদ্দ নেওয়ার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।’
মিরপুর ব্যবসায়ী কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের অতিরিক্ত বরাদ্দপ্রাপ্ত ২০০ জন সদস্যের মধ্যে ১৫৩৫ নম্বর সদস্য হিসাবে তার নাম অন্তর্ভুক্তিসহ সিটি করপোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং নথিপত্র তার বাসায় রাখার প্রমাণও পায় দুদক।
মেয়র কোটার বাড়তি টাকা
ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২ এ ব্লকের ষষ্ঠ তলায় মেয়র কোটায় ১০৩টি দোকান বরাদ্দের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। এসব দোকান জাতীয় ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য বিশিষ্টজনকে বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এজন্য তাদের বর্গফুট হিসাবে করপোরেশনে সেলামি হিসেবে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু দোকান প্রতি নেওয়া হচ্ছে ১৭ লাখ টাকা।
কয়েকজন দোকান মালিক অভিযোগ করে বলেছেন, ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের বরাদ্দ কমিটি থাকলেও মেয়র কোটার দোকান বরাদ্দে কাজ করছেন আতাহার।
দুইবার অপসারিত একবার বদলি
বিকম এবং এমকম সনদ জালিয়াতি ও নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে ২০১০ সালে মামলা হলে ২০১২ সালে আতাহারকে বরখাস্ত করা হয়। আদালতের আদেশে ২০১৯ সালে তিনি ফের চাকরিতে যোগ দেন। ২০২০ সালের ২০ মে আবার তাকে অপসারণ করা হয়।
২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বদলি করলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি। ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতের অদেশে তিনি ডিএসসিসিতে বহাল হন।
মামলা ও পরোয়ানা
বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট দুদক আতাহারের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অর্থ পাচারের অভিযোগে এই মামলাটি হয়।
সেই মামলায় ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-২ তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। দুদকের করা অপর এক মামলায় আদালত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিলে তিনি গ্রেপ্তার হন।
ডুপ্লেক্স বাড়ি, ফ্ল্যাট ও গাড়ি
নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে কয়েক মাস আগে আতাহারের ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণকাজ শেষ করেছেন আতাহার। সেই বাড়ি নির্মাণে যে কয়েক কোটি টাকা খরচ হয়েছে, তা দেখলেই বোঝা যায়।
আগে ঢাকার ৮/১ তোপখানা রোডের সেগুন বাগিচায় থাকতেন। পরে ৫৫/১ সিদ্বেশ্বরী রোডের রূপায়ন স্বপ্ন নিলয় ভবনের (ডি-১৩) ফ্ল্যাটটি সাড়ে তিন কোটি টাকায় কেনার তথ্য মিলেছে।
ভবনের নিরাপত্তায় থাকা ডেল্টা ফোর্সের সদস্য মাহাবুব ছবি দেখে তার ওই ভবনে বসবাসের তথ্য নিশ্চিত করেন। ভবনের ম্যানেজার সোহেল পারভেজ জানিয়েছেন, ফ্ল্যাটটি আতাহার আলী খানের। তার ব্যবহৃত জিপ গাড়ির নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ ১২-২৩১১।


