ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনের ১২৯ ওয়ার্ডে বর্তমানে কোনো কাউন্সিলর নেই। এর ফলে নাগরিক সেবা দেওয়ার পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে মাত্র ২০ জন আঞ্চলিক কর্মকর্তার ওপর।
কাজের এই অতিরিক্ত চাপের কারণে কর্মকর্তারা হিমশিম খাচ্ছেন, যার ফলে সেবামূলক কাজে দেরি হচ্ছে, জটিলতা বাড়ছে, চরম আকার ধারণ করছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। একই সঙ্গে থমকে গেছে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি।
চট্টগ্রামেও একই চিত্র দেখা গেছে, সেখানকার ৪১টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ১৬ জন কর্মকর্তা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে প্রথমে সিটি করপোরেশনগুলো ভেঙে দেয়। এরপর একে একে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভাও ভেঙে দেওয়া হয়। বর্তমানে ৪৫০টিরও বেশি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬১টি জেলা পরিষদ ও ১১টি সিটি করপোরেশন সরকারিভাবে নিযুক্ত প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রাম ছাড়া অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোর প্রশাসকদের সরিয়ে সেখানে নিজেদের দলীয় নেতাদের দায়িত্ব দেয়। তবে নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকায় স্থানীয় পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। নাগরিক সেবা দেওয়ার গতি এখনো ধীর এবং জনগণের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া অসম্ভব। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে যে জবাবদিহিতা থাকে, তা সরকারিভাবে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে থাকে না।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন শুরু হতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন এক বছরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, নতুন আইন অনুযায়ী এখন থেকে মেয়র ও চেয়ারম্যান পদে কোনো দলীয় প্রতীক ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সাধারণত জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, চারিত্রিক সনদ, উত্তরাধিকার সনদ এবং টিসিবি কার্ড দেওয়ার মূল দায়িত্ব ওয়ার্ড কার্যালয়গুলোর। এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কাউন্সিলরের স্বাক্ষর অপরিহার্য। তারা না থাকায় এখন নাগরিকদের অতিরিক্ত সময় লাগছে, পোহাতে হচ্ছে নানা রকমের ভোগান্তি।
ঢাকার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, আগে যে কাজগুলো করতে মাত্র একদিন সময় লাগত, এখন তা করতে কয়েক দিন থেকে শুরু করে এক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে। আবেদনের প্রক্রিয়াটিও এখন অনেক জটিল এবং ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হচ্ছে।
আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা জুনায়েদ ইকবাল বলেন, ‘একটি নাগরিকত্ব সনদ নেওয়ার জন্য আমাকে প্রথমে একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে আবেদন করতে হয়েছে। ওয়ার্ড সচিব আবেদনটি জমা নেওয়ার পর আমাকে এক সপ্তাহ পরে আসতে বলেছেন।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বাড়ির পাশেই একটি খাল আছে। সেই খালের দুর্গন্ধে এখন এলাকায় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই বিষয়ে কার কাছে অভিযোগ করব, তা বুঝতে পারছি না। একজন কাউন্সিলর থাকলে অন্তত তার কার্যালয়ে গিয়ে একটা অভিযোগ জানাতে পারতাম।’
অন্যদিকে, রেভান আহমেদ নামে আরেকজন বাসিন্দা জানান, এলাকায় মশার উপদ্রব মারাত্মকভাবে বাড়লেও তা দূর করার জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
কাউন্সিলর না থাকায় ওয়ার্ড সচিবরাও কাজ করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব টাইমসকে বলেন, ‘আগে কাউন্সিলররা নথিপত্রে স্বাক্ষর করতেন আর আমরা সেগুলো যাচাই করে দ্রুত কাজ শেষ করতাম। কিন্তু এখন সবকিছু ধাপে ধাপে করতে হয়। সব কাগজপত্রসহ আবেদনগুলো প্রথমে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে কর্মকর্তারা সেগুলো যাচাই করেন এবং সবশেষে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেন।’
বর্তমানে প্রতিটি আঞ্চলিক কর্মকর্তাকে সাত থেকে দশটি করে ওয়ার্ডের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে, যার ফলে তাদের টেবিলে ফাইলের পাহাড় জমছে। একটি সনদপত্র পেতেই এখন দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
সচিবরা আরও জানান, কাউন্সিলর না থাকার কারণে ড্রেন পরিষ্কার করা, মশা নিধন এবং রাস্তা মেরামতের মতো জরুরি কাজগুলোও আটকে আছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, সিলেট, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা, বরিশাল, রংপুর এবং খুলনা সিটি করপোরেশনে ভোট গ্রহণের ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই। এই সবকটি সিটি করপোরেশনই এখন নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়াদ যথাক্রমে ২০২৫ সালের ২ ও ১ জুন শেষ হয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়াদ ২০২৭ সালে; সিলেট, রাজশাহী, গাজীপুর, বরিশাল ও খুলনার মেয়াদ ২০২৮ সালে এবং ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়াদ ২০২৯ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মেয়র ও কাউন্সিলরদেরকে অপসারণ করার কারণে এই পদগুলো শূন্য হওয়ায় নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।
অন্যদিকে, আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে আছেন শাহাদাত হোসেন। আগের নির্বাচন অনুসারে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। তবে মেয়র বলছেন, আদালতের রায়ে তাকে দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে পাঁচ বছর মেয়র থাকার অধিকার দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, মেয়র পদচ্যুত হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে এই নির্বাচনগুলো পেছানো হয়েছে।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো নির্বাচিত প্রতিনিধি। এই নিয়মটি জাতীয় এবং স্থানীয়—উভয় পর্যায়ের জন্যই প্রযোজ্য। জনগণের ভোগান্তি কমানোর সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান হলো, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা।’
একই রকমের পরিস্থিতি দেখা গেছে দেশের জেলা শহরগুলোতেও। জামালপুর পৌরসভার দরিপাড়ার বাসিন্দা শাওন মোল্লা বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে নাগরিক সনদের জন্য পৌরসভায় গিয়েছিলাম। আগে কাউন্সিলররা এই কাজে খুব সাহায্য করতেন। কিন্তু এখন চেনাজানা কোনো কর্মকর্তাই সেখানে নেই। আমাকে অপ্রয়োজনে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।’
ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিয়ন পরিষদ ভাঙেনি। কিন্তু যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতারা চেয়ারম্যান ছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তারা আত্মগোপনে আছেন। ফলে সেখানেও তৈরি হয়েছে শূণ্যতা, কাজে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
গত ৪ মে সকাল ১০টায় জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়ন পরিষদের বাইরে ব্যাগ হাতে ক্লান্ত শরীরে বসে থাকতে দেখা যায় ৬০ বছর বয়সী আমেশা বেগমকে। সরকারি টিসিবি কার্ডে তার নাম আছে কি না, তা নিশ্চিত হতেই তিনি সেখানে এসেছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তিনি কোনো প্রতিনিধি বা কর্মকর্তার দেখা পাননি।
আমেশা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি এখানে কয়েক ঘণ্টা ধরে বসে আছি, কিন্তু কোনো মানুষের দেখা পাচ্ছি না। চেয়ারম্যান সাহেব থাকলে এমনটা কখনোই হতো না।’
জামালপুর শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শরিফপুর ইউনিয়নের এই চিত্রটি একটি নীরব সংকটের কথাই মনে করিয়ে দেয়। ইউনিয়ন পরিষদ খোলা থাকলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
শরিফপুর ইউনিয়নের হিসাব সহকারী শায়লা বেগম শিলা বলেন, ‘আমাদের এখন চেয়ারম্যানের কাজও করতে হচ্ছে। অনেকেই তাদের দরকারি কাগজপত্র আমাদের কাছে রেখে যাচ্ছেন, যার ফলে আমাদের কাজের চাপ অনেক বেড়ে গেছে।’


